- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রস্তাবনা: প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হলো একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এবং নীতিমালার সমন্বয়। এটি ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সকল প্রকার কর্মকাণ্ডকে সুষ্ঠু, সুশৃঙ্খল এবং কার্যকরভাবে পরিচালনা করার একটি কলা ও বিজ্ঞান। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদ, জনবল, সময় ও অন্যান্য উপাদানকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যাতে সর্বোচ্চ সফলতা নিশ্চিত করা যায়। এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।
প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কথাটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন কার্যকে সুসংগঠিত করা’। এই কাজটি সম্পাদন করার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি ও নীতির অনুসরণ করা হয়। সহজ ভাষায়, এটি হলো একটি দল বা প্রতিষ্ঠানকে সঠিক পথে পরিচালনা করার পদ্ধতি।
প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে ইংরেজি ভাষায় বলা হয় ‘Public Administration’। এটি মূলত মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হলো কার্যকরভাবে ও দক্ষতার সাথে জনসেবা নিশ্চিত করা।
বিভিন্ন মনীষী, গবেষক ও অধ্যাপক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা নিচে তুলে ধরা হলো:
১। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson): “প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হলো আইনের বিস্তারিত এবং সুশৃঙ্খল প্রয়োগ। প্রতিটি নির্দিষ্ট কাজ একটি সুনির্দিষ্ট আইনের প্রয়োগ।” (Public Administration is the detailed and systematic execution of public law. Every particular application of general law is an act of administration.)
২। এল. ডি. হোয়াইট (L. D. White): “প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হলো সেই সকল কাজ যা কোনো একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য করা হয়।” (Public Administration consists of all those operations having for their purpose the fulfillment or enforcement of public policy.)
৩। লুথার গুলিক (Luther Gulick): “প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হলো ‘POSDCORB’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ, যেখানে P হলো Planning (পরিকল্পনা), O হলো Organizing (সংগঠিত করা), S হলো Staffing (কর্মী সংস্থান), D হলো Directing (নির্দেশনা), Co হলো Co-ordinating (সমন্বয় সাধন), R হলো Reporting (প্রতিবেদন) এবং B হলো Budgeting (বাজেট প্রণয়ন)।” (Public Administration is the execution of public policy, and the acronym POSDCORB is often used to describe its functions.)
৪। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): “প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হলো একদল লোকের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় সাধনের কৌশল, যা সরকারি নীতি বাস্তবায়নে সাহায্য করে।” (Public Administration is the coordination of group effort in the pursuit of public policy.)
৫। সাইমন, স্মিথবার্গ ও থাম্পসন (Simon, Smithburg and Thompson): “প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বলতে এমন কর্মকাণ্ডকে বোঝায়, যা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত নীতি ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সংঘটিত হয়।” (Public Administration is the activity of implementing the policies and programs of the government.)
৬। ডিমক ও ডিমক (Dimok and Dimok): “প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হলো রাষ্ট্রের কার্যকরী অংশ, যার মাধ্যমে সরকারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়।” (Public Administration is the part of the state in action, and it is the execution of government objectives and purposes.)
৭। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): “প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এমন একটি প্রক্রিয়া, যা মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি, আইন ও পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তব রূপ দেয়।” (Public administration is the art and science of management as applied to the affairs of the state.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায় যে, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হলো একটি সুশৃঙ্খল এবং পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। এর মূল কাজ হলো সরকারের নীতি, পরিকল্পনা এবং আইনকে বাস্তব রূপ দেওয়া। এটি মানব সম্পদ, অর্থ, সময় ও প্রযুক্তির মতো বিভিন্ন উপাদানকে এমনভাবে ব্যবহার করে যাতে জনসাধারণের জন্য কল্যাণকর ফলাফল অর্জন করা যায়। এটি কেবল নিয়ম-কানুন মেনে চলা নয়, বরং সৃজনশীল উপায়ে সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে জনসেবা নিশ্চিত করার একটি বিজ্ঞান ও কৌশল।
উপসংহার: প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হলো একটি দেশের সরকারের মেরুদণ্ড। এটি ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে চলতে পারে না। এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে শৃঙ্খলা, কার্যকারিতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি দেশ তার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হলো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারি নীতিমালা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের কৌশল।
১৯৪০ এর দশকে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯০৯ সালে আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এই বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করে। ১৯১৮ সালের পর থেকে এটি বিভিন্ন দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে স্থান করে নেয়। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।

