- readaim.com
- 0
উত্তর।।মুখবন্ধ: ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তার সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, মানুষ কোনো নিরঙ্কুশ শক্তির অধীন নয়, বরং নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করে। রুশোর এই ধারণা ফরাসি বিপ্লবসহ পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা ছিল।
রুশোর মতে, সভ্য সমাজ গঠনের আগে মানুষ এক প্রাকৃতিক অবস্থায় বাস করত। এই অবস্থায় মানুষ ছিল স্বাধীন ও স্বনির্ভর। তাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য ছিল না। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব এবং সমাজের জটিলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই প্রাকৃতিক শান্তি নষ্ট হতে শুরু করে। এর ফলে মানুষ নিজেদের মধ্যে সংঘাত এড়াতে এবং নিজেদের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করতে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।
এই চুক্তি অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তি তার সমস্ত প্রাকৃতিক অধিকার ও স্বাধীনতা সমাজের সমষ্টিগত ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করে। এর বিনিময়ে সে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সবার কাছ থেকে সমান অধিকার ও সুরক্ষা লাভ করে। রুশো এই সমষ্টিগত ইচ্ছাকে সাধারণ ইচ্ছা (General Will) হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এটি কোনো বিশেষ ব্যক্তির ইচ্ছা নয়, বরং সমগ্র সমাজের সম্মিলিত ইচ্ছা, যা সমাজের সামগ্রিক মঙ্গলের জন্য কাজ করে। সাধারণ ইচ্ছা কখনোই ভুল করে না এবং এটিই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উৎস। অর্থাৎ, রাষ্ট্র বা সরকার সাধারণ ইচ্ছার বাস্তবায়নকারী মাত্র। যদি কোনো সরকার সাধারণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করে, তাহলে জনগণের সেই সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার অধিকার আছে।
উপসংহার: রুশোর সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব আধুনিক গণতন্ত্রের এক মৌলিক ভিত্তি। এটি বোঝায় যে, রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছ থেকে পায় এবং সরকারের বৈধতা জনগণের সম্মতির উপর নির্ভরশীল। এটি শাসক ও শাসিতের মধ্যে একটি পারস্পরিক বোঝাপড়ার সম্পর্ক স্থাপন করে। এই তত্ত্ব ব্যক্তি স্বাধীনতার গুরুত্বকে তুলে ধরে এবং দেখায় যে, ব্যক্তি রাষ্ট্রের দাস নয়, বরং রাষ্ট্রের স্রষ্টা।
রুশোর এই তত্ত্বটি ১৭৬২ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ “দ্য সোশ্যাল কন্ট্যাক্ট” (Du Contrat social ou Principes du droit politique)-এ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়। তার এই ধারণা ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) এবং আমেরিকান বিপ্লবের (১৭৭৫-১৭৮৩) মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল। থমাস হবসের (Thomas Hobbes) মতো দার্শনিকদের নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের ধারণার বিপরীতে রুশো জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে যুক্তি দেন।

