- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো দারিদ্র্য, ঋণ, বেকারত্ব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও আর্থিক সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদারে বিশ্বব্যাংক ঋণ, অনুদান, নীতি সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তৃতীয় বিশ্বের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা:
১। উন্নয়ন ঋণ: বিশ্বব্যাংক তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক সহজ শর্তে উন্নয়ন ঋণ প্রদান করে। এসব অর্থ অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়। ফলে উৎপাদন বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।
২। দারিদ্র্য হ্রাস: দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় ও জীবনমান উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে। সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তা দেওয়া হয়। এতে দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা কমানো সম্ভব হয়।
৩। অবকাঠামো উন্নয়ন: রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি, বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দেয়। উন্নত অবকাঠামো উৎপাদন ও বাণিজ্য সহজ করে, পরিবহন ব্যয় কমায় এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও স্থিতিশীল হয়।
৪। কৃষি উন্নয়ন: তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হওয়ায় বিশ্বব্যাংক কৃষি উন্নয়নে অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়। সেচ, উন্নত বীজ, কৃষিযন্ত্র, বাজার ব্যবস্থা ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করা হয়। এতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ে এবং কৃষকের আয় ও খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হয়।
৫। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পগুলো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সহায়তা করে। বিশেষ করে যুবক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা শক্তিশালী হয়।
৬। মানবসম্পদ উন্নয়ন: বিশ্বব্যাংক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে। দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং শ্রমবাজারে ভালো সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী মানবসম্পদ গড়ে তুলে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারে।
৭। স্বাস্থ্য খাত: স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে হাসপাতাল, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুসেবা, টিকাদান ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাংক সহায়তা দেয়। সুস্থ জনগোষ্ঠী বেশি উৎপাদনশীল হওয়ায় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। চিকিৎসা ব্যয় কমলে দরিদ্র পরিবারগুলোর আর্থিক চাপও কমে এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়ে।
৮। আর্থিক সংস্কার: বিশ্বব্যাংক অনেক দেশে ব্যাংকিং, করব্যবস্থা, সরকারি ব্যয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারে নীতি সহায়তা দেয়। স্বচ্ছ ও কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। দুর্বলতা কমলে বিনিয়োগ বাড়ে এবং সরকারের উন্নয়ন ব্যয় আরও ফলপ্রসূভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
৯। সুশাসন সহায়তা: দুর্নীতি, অদক্ষতা ও দুর্বল প্রশাসন অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় বাধা। বিশ্বব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহায়তা করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারি অর্থের অপচয় কমে এবং জনগণের জন্য উন্নয়নমূলক সেবা আরও কার্যকর হয়।
১০। বিনিয়োগ পরিবেশ: বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব নীতি, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কারে বিশ্বব্যাংক সহায়তা করে। বিনিয়োগের বাধা কমলে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প ও ব্যবসা স্থাপনে উৎসাহিত হন। এতে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়ে এবং অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
১১। ক্ষুদ্র উদ্যোগ: ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা উন্নয়নে ঋণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাংক সহায়তা করে। এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের বড় উৎস। তাদের সক্ষমতা বাড়লে গ্রামীণ ও শহুরে উভয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয় এবং আয় বৈষম্য কমে।
১২। সামাজিক সুরক্ষা: দরিদ্র, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও সংকটাপন্ন মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে বিশ্বব্যাংক সহায়তা দেয়। নগদ সহায়তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কর্মসূচিতে অর্থায়ন করা হয়। এতে অর্থনৈতিক ধাক্কার সময় মানুষ ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখতে পারে।
১৩। সংকট মোকাবিলা: অর্থনৈতিক মন্দা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা খাদ্যসংকটের সময় বিশ্বব্যাংক জরুরি অর্থায়ন ও নীতি সহায়তা প্রদান করে। দ্রুত অর্থের ব্যবস্থা সরকারকে বাজেট ঘাটতি, পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তা চালিয়ে যেতে সাহায্য করে। ফলে অর্থনীতির আকস্মিক পতন কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
১৪। জলবায়ু অর্থায়ন: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো কৃষি, অবকাঠামো ও জীবিকায় বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। বিশ্বব্যাংক জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দুর্যোগ প্রস্তুতিতে অর্থায়ন করে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতি কমে এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
১৫। নীতি পরামর্শ: বিশ্বব্যাংক অর্থনীতি, দারিদ্র্য, রাজস্ব, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ে গবেষণা ও নীতি পরামর্শ দেয়। তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ সরকারকে দুর্বলতা চিহ্নিত করতে এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। সঠিক নীতি গ্রহণ করলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সম্ভাবনা বাড়ে।
১৬। নারীর অংশগ্রহণ: নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন প্রকল্পে সহায়তা দেয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে পরিবারের আয় ও সঞ্চয় বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হয়।
১৭। আন্তর্জাতিক সহায়তা: বিশ্বব্যাংক সরকার, দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে সহায়তা করে। অর্থ, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মাধ্যমে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হয়। এই সহযোগিতা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
উপসংহার: তৃতীয় বিশ্বের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা বহুমুখী। ঋণ, দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক সংস্কারে এর সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঋণ যেন অতিরিক্ত বোঝা না হয় এবং প্রকল্পগুলো জাতীয় প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।