- readaim.com
- 0
উত্তর।।সূচনা: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পলিটিক্স’-এ বিভিন্ন ধরনের সরকার ব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। তিনি গণতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের মতো প্রচলিত ব্যবস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে একটি নতুন ধরনের শাসনব্যবস্থার প্রস্তাব করেন, যা হলো ‘পলিটি’। অ্যারিস্টটল মনে করতেন যে এটি হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যা সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের জন্য একটি স্থিতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম।
অ্যারিস্টটল পলিটিকে বাস্তবায়নযোগ্য সর্বোত্তম সরকার হিসেবে বর্ণনা করেছেন কারণ এটি দুটি চরমপন্থার মধ্যবর্তী একটি পথ। এই দুটি চরমপন্থা হলো:
- অলিগার্কি (ধনিকতন্ত্র): এই ব্যবস্থায় সমাজের ধনী শ্রেণি শাসন করে। এতে সম্পদের অসম বণ্টন হয় এবং গরিবদের অধিকার উপেক্ষা করা হয়। ফলে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।
- গণতন্ত্র (ডেমোক্রেসি): অ্যারিস্টটলের মতে, গণতন্ত্রের একটি ত্রুটি হলো এখানে গরিব সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন চলে। এতে ধনীরা বঞ্চিত হতে পারে এবং শাসনব্যবস্থা বিশৃঙ্খল হতে পারে।
অ্যারিস্টটল ‘পলিটি’কে এই দুই ব্যবস্থার একটি সংমিশ্রণ হিসেবে দেখেছেন। পলিটিতে একদিকে যেমন ধনী ও গরিব উভয় শ্রেণিরই অংশগ্রহণ থাকে, তেমনি এর মূল লক্ষ্য থাকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্ষমতাকে সুসংহত করা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে যুক্তিসংগত এবং স্থিতিশীল। তারা অত্যধিক ধনী বা অত্যধিক গরিব নয়, তাই তারা অন্যদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না। মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সমাজে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও স্থায়িত্ব আসে।
পলিটি একটি সংবিধানভিত্তিক শাসনব্যবস্থা যা আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে শাসনকর্তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয়, বরং লিখিত আইনই প্রাধান্য পায়। এর ফলে শাসনব্যবস্থা ব্যক্তিগত স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্ত থাকে। অ্যারিস্টটল মনে করতেন যে, এই ধরনের সরকার ব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে এবং সমাজে ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে।
উপসংহার: অ্যারিস্টটল ‘পলিটি’কে বাস্তবায়নযোগ্য সর্বোত্তম সরকার বলেছেন কারণ এটি ধনী ও গরিবের শাসনতন্ত্রের ত্রুটিগুলো দূর করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা করে। তিনি একে মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসনের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য ন্যায় ও অধিকার নিশ্চিত করার একটি কার্যকর উপায় হিসেবে দেখেন। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে আইনই সর্বোচ্চ, যা যেকোনো স্বেচ্ছাচারী শাসনের বিপদ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করে।
অ্যারিস্টটল ‘পলিটি’কে একটি মধ্যপন্থী এবং ভারসাম্যপূর্ণ সরকার ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছেন, যা ধনিকতন্ত্র ও গণতন্ত্রের ত্রুটিগুলো পরিহার করে।
অ্যারিস্টটলের ‘পলিটিক্স’ আনুমানিক ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রচিত হয়। তাঁর এই দর্শন মধ্যযুগ ও রেনেসাঁর সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করে। প্রাচীন রোমান প্রজাতন্ত্রের সরকার ব্যবস্থায় তাঁর চিন্তাভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। আধুনিক যুগেও সংবিধানবাদ ও মিশ্র সরকার ব্যবস্থার ধারণায় অ্যারিস্টটলের এই মতবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

