- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: আইনের শাসন হলো আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি মূল ভিত্তি। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছার পরিবর্তে আইন নিজেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা ধারণ করে। এই ধারণাটি সমাজের প্রত্যেক সদস্যকে সমানভাবে আইনের অধীনে নিয়ে আসে, তা সে সাধারণ নাগরিক হোক বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তি। আইনের শাসন সমাজের স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে।
আইনের শাসন – এর পরিচয়: শাব্দিক অর্থে, ‘আইনের শাসন’ হলো ‘আইনের দ্বারা শাসন’ বা ‘আইনের অধীনে শাসন’। এর মূল কথা হলো, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে মানুষের ইচ্ছায় নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ও সর্বজনীনভাবে প্রণীত আইনের মাধ্যমে। এই ধারণাটি স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্ত একটি সমাজের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে সবাই আইনের চোখে সমান।
আইনের শাসন বলতে বোঝায় এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যেখানে সমাজের সকল মানুষ, সংস্থা, এবং সরকার নিজেই আইনের প্রতি দায়বদ্ধ। এটি আইনের প্রাধান্য, সকলের জন্য আইনের সমান প্রয়োগ, এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো মূলনীতিগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। আইনের শাসন নিশ্চিত করে যে ক্ষমতা কেবল আইনের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ব্যবহার করা হবে এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এটি ব্যক্তির মৌলিক অধিকার রক্ষা করে এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে।
- অ্যারিস্টটল (Aristotle): “আইনের শাসন হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে আইন দ্বারা ক্ষমতা পরিচালিত হয়, এবং শাসনকর্তা কেবল আইনের রক্ষক।” (The rule of law is a condition where power is governed by law, and the ruler is merely the guardian of the law.)
- সিসেরো (Cicero): “আমরা আইনের দাস, যেন আমরা স্বাধীন হতে পারি।” (We are slaves of the law, so that we may be free.)
- অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): “আইনের শাসন হলো এমন একটি নীতি, যেখানে সমাজের সকল মানুষ, প্রতিষ্ঠান, এবং সরকারি কর্মকর্তাগণ সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত এবং সবার প্রতি সমানভাবে প্রযোজ্য আইনের প্রতি দায়বদ্ধ।” (The rule of law is the principle whereby all members of a society, including institutions and government officials, are accountable to laws that are publicly promulgated, equally enforced, and independently adjudicated.)
- জন লক (John Locke): “যেখানে আইনের শাসন থাকে না, সেখানে স্বাধীনতার অস্তিত্ব থাকতে পারে না।” (Where there is no law, there is no freedom.)
- এ. ভি. ডাইসি (A. V. Dicey): ডাইসি আইনের শাসনের তিনটি মূলনীতি ব্যাখ্যা করেছেন: ১. আইনের প্রাধান্য (Supremacy of Law), ২. সকলের জন্য সমান আইন (Equality before Law), এবং ৩. সংবিধানের সাধারণ আইনগত ভিত্তি (Predominance of the Legal Spirit)।
- হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski): “আইনের শাসন হলো ক্ষমতাকে শৃঙ্খলিত করার একটি পদ্ধতি, যা মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশের জন্য অপরিহার্য।” (The rule of law is a method of disciplining power, which is essential for the development of human personality.)
- ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ম্যাক্স ওয়েবার ‘আইনগত-যুক্তিপূর্ণ কর্তৃত্ব’ (Legal-rational authority) এর কথা বলেছেন, যা আইনের শাসনের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা নিয়মের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, কোনো ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নয়।
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি যে, আইনের শাসন হলো একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছার পরিবর্তে আইনই চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এটি এমন একটি নীতি, যেখানে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে, আইনের চোখে সবাই সমান, এবং প্রত্যেক নাগরিক তার অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। আইনের শাসন নিশ্চিত করে যে সরকারও আইনের অধীনে পরিচালিত হবে এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
উপসংহার: আইনের শাসন কেবল একটি আইনি ধারণা নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত। এটি ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে, মানুষের অধিকার সুরক্ষিত রাখে এবং সমাজে স্থিতিশীলতা আনে। যেখানে আইনের শাসন থাকে, সেখানে স্বৈরাচার বা স্বেচ্ছাচারিতার কোনো স্থান নেই, বরং একটি সাম্য ও ন্যায়বিচারের সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
আইনের শাসন হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো ব্যক্তি নয়, বরং আইন নিজেই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী।
আইনের শাসনের ধারণাটি প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী) বিকশিত হয়। আধুনিক যুগে এর মূল ভিত্তি স্থাপন করেন ব্রিটিশ আইনবিদ এ. ভি. ডাইসি, ১৮৮৫ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Introduction to the Study of the Law of the Constitution’-এ। ২০ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জাতিসংঘের বিভিন্ন দলিল এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে (১৯৪৮) আইনের শাসনকে একটি মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যায়, যে দেশগুলোতে আইনের শাসন শক্তিশালী, সেখানে দুর্নীতি কম এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশি।

