- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: ডেভিড রিকার্ডোর তুলনামূলক ব্যয় সুবিধা তত্ত্ব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি মৌলিক ভিত্তি। এই তত্ত্ব অনুসারে, দুটি দেশের মধ্যে কোনো একটি দেশ উভয় পণ্য উৎপাদনে পরম সুবিধা (absolute advantage) ভোগ করলেও, দেশগুলো তুলনামূলক সুবিধার (comparative advantage) ভিত্তিতে বাণিজ্য করলে উভয়ই লাভবান হতে পারে। মূলত, দেশগুলো সেই পণ্য উৎপাদনে বিশেষায়ন করবে যেখানে তাদের সুযোগ ব্যয় (opportunity cost) সবচেয়ে কম, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করে।
ডেভিড রিকার্ডো তাঁর বিখ্যাত “On the Principles of Political Economy and Taxation” গ্রন্থে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তুলনামূলক ব্যয় সুবিধা তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন। অ্যাডাম স্মিথের পরম ব্যয় সুবিধা তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা দূর করে রিকার্ডো দেখান যে, দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যের জন্য পরম সুবিধার প্রয়োজন নেই, বরং তুলনামূলক সুবিধা থাকাই যথেষ্ট।
তত্ত্বের মূল বক্তব্য: যদি দুটি দেশ দুটি পণ্য উৎপাদনে নিযুক্ত থাকে এবং একটি দেশ অন্য দেশের চেয়ে উভয় পণ্যই কম খরচে উৎপাদন করতে পারে (অর্থাৎ পরম সুবিধা থাকে), তবুও দেশ দুটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লাভবান হতে পারে। এক্ষেত্রে, প্রত্যেক দেশ সেই পণ্যটি উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিশেষায়ন করবে, যেটিতে তার তুলনামূলক সুবিধা সবচেয়ে বেশি (অর্থাৎ সুযোগ ব্যয় কম) এবং অন্য পণ্যটি আমদানি করবে।
অনুমিতিসমূহ: এই তত্ত্বটি আলোচনা করতে গিয়ে ডেভিড রিকার্ডো কিছু অনুমিতির বর্ণনা করেন। নিম্নে সেই অনুমিতিসমূহ দেওয়া হলো –
- ১। দুটি দেশ থাকবে।
- ২। দুটি পণ্য উৎপাদন করবে।
- ৩। উপকরনসমূহ পূর্ণমাত্রায় গতিশীল হলেও আর্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের কোন গতিশীলতা থাকবে না।
- ৪। পরিবহন ব্যায় অনুপস্থিত।
- ৫। উৎপাদন ব্যায় অপরিবর্তনীয়।
- ৬। বাণিজ্যের উপর কোন বিধিনিষেধ নাই।
- ৭। শ্রমের পূর্ণ নিয়োগ বিদ্যমান।
- ৮। প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা স্থির।
- ৯। অর্থনীতিতে পূর্ণপ্রতিযোগিতা বিদ্যমান।
- ১০। রুচি এবং উৎপাদন কৌশল প্রদত্ত হবে।
Country | সুযোগ ব্যায় | |
– | মদ | কাপড় |
Portugal | ৮০/৯০ = ৮/৯ | ৯০/৮০ = ৯/৮ |
England | ১২০/১০০ = ১২/১০ | ১০০/১২০ = ১০/১২ |
বামপার্শে ছকের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কাপড় উৎপাদনে ইংল্যান্ডে নিম্ন সুযোগ ব্যায় এবং মদ উৎপাদনে ইংল্যান্ডে নিম্ন সুযোগ ব্যায় দেখা যাচ্ছে। তাই আমরা বলতে পরি, কাপড় উৎপাদনে ইংল্যান্ডের, আর মদ উৎপাদনে পর্তুগালের তুতনামূলক সুবিধা আছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ২ দেশের মধ্যে একটি দেশে উভয় দ্রব্য পরম সুবিধা থাকলেও তুলনামূলক সুবিধা বা অসুবিধা বিবেচনার প্রেক্ষিতে বাণিজ্য কার্যক্রম লাভজনকভাবে বিবেচিত হতে পারে। রিকার্ডো এর মাধ্যমেই প্রমান করেন যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘটিত হয়ার জন্য তুলনামূলক ব্যয় সুবিধায় যথেষ্ট। আর পরম ব্যায় সুবিধার প্রয়োজন নাই।





অন্যদিকে A দেশ যদি OE পরিমাণ Y এর বিনিময়ে
এর চেয়ে বেশি X দ্রব্য B দেশ হতে আমদানি করতে পারে তবে বাণিজ্য লাভজনক বলে বিবেচিত হবে। রিকার্ডো এভাবে দুটি দেশের আপেক্ষিক ব্যায় অনুপাতের মধ্যে যতক্ষণ পর্যন্ত পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পণ্যের বিশেষায়ন লাভজনক বলে বিবিচিত হবে পারে।
রিকার্ডোর এই তত্ত্বটি প্রভাবশালী হলেও অনেক অর্থনীতিবিদ এর কিছু সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন, যা নিচে আলোচনা করা হলো –
১।অবাস্তব অনুমিতি এই তত্ত্বটি দুটি দেশ, দুটি পণ্য এবং শ্রমকে একমাত্র উপকরণ হিসেবে ধরে নেয়, যা বাস্তব বিশ্বের জটিলতার সাথে মেলে না। আধুনিক বিশ্বে বহু দেশ এবং হাজারো পণ্য রয়েছে। এছাড়া পরিবহন ব্যয়, বাণিজ্য বাধা এবং উপকরণের আন্তর্জাতিক গতিশীলতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা তত্ত্বটির বাস্তব প্রয়োগকে সীমিত করে তোলে। এই সরলীকরণগুলো তত্ত্বটিকে একটি তাত্ত্বিক মডেলে পরিণত করেছে, কিন্তু বাস্তব বাণিজ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এর কার্যকারিতা কম।
২।শ্রমই একমাত্র উৎপাদনের উপকরণ নয় রিকার্ডো শ্রমকে উৎপাদনের একমাত্র উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং পণ্যের মূল্য নির্ধারণে “শ্রম মূল্য তত্ত্ব” ব্যবহার করেছেন। কিন্তু বাস্তবে, শ্রমের পাশাপাশি পুঁজি, ভূমি এবং প্রযুক্তি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। এই উপকরণগুলোর প্রাপ্যতা ও ব্যয় একটি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা এবং তুলনামূলক সুবিধা নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে। শুধুমাত্র শ্রমের উপর ভিত্তি করে ব্যয় গণনা করা আধুনিক অর্থনীতির জন্য একটি ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি।
৩।পরিবহন ব্যয়ের অনুপস্থিতি তত্ত্বটি ধরে নেয় যে দেশগুলোর মধ্যে পণ্য আদান-প্রদানে কোনো পরিবহন ব্যয় নেই। বাস্তবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পরিবহন ব্যয় একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ভারী বা পচনশীল পণ্যের জন্য, পরিবহন ব্যয় এতটাই বেশি হতে পারে যে তা দুটি দেশের মধ্যে তুলনামূলক সুবিধার কারণে সৃষ্ট লাভের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। ফলে, তত্ত্ব অনুযায়ী সম্ভাব্য বাণিজ্য বাস্তবে সংঘটিত নাও হতে পারে।
৪।স্থির উৎপাদন ব্যয় রিকার্ডোর মডেলে স্থির উৎপাদন ব্যয় বা Constant Returns to Scale ধরে নেওয়া হয়েছে, যার অর্থ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লেও একক প্রতি ব্যয় স্থির থাকে। কিন্তু বাস্তবে, অনেক শিল্পে ক্রমবর্ধমান ব্যয় (Increasing Returns to Scale) বা ক্রমহ্রাসমান ব্যয় (Decreasing Returns to Scale) দেখা যায়। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের নিয়ম বাণিজ্যের ধরন এবং লাভের পরিমাণকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যা এই তত্ত্বে উপেক্ষিত হয়েছে।
৫।পূর্ণ বিশেষায়নের সমস্যা এই তত্ত্ব অনুযায়ী, দেশগুলোর উচিত তুলনামূলক সুবিধাসম্পন্ন পণ্যে সম্পূর্ণ বিশেষায়ন করা। কিন্তু বাস্তবে কোনো দেশই একটি বা দুটি পণ্যের উপর পুরোপুরি নির্ভর করে না। কারণ, পূর্ণ বিশেষায়ন দেশের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা ও মূল্যের আকস্মিক পরিবর্তনের কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য দেশগুলো সাধারণত উৎপাদনে বৈচিত্র্য বজায় রাখে।
৬।বাণিজ্য নীতির উপেক্ষা তত্ত্বটি মুক্ত বাণিজ্যের ধারণা দেয় এবং কোনো ধরনের বাণিজ্য বাধা, যেমন—শুল্ক, কোটা বা ভর্তুকির অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। কিন্তু বাস্তব বিশ্বে, প্রায় সব দেশই নিজেদের অভ্যন্তরীণ শিল্পকে রক্ষা করতে বিভিন্ন ধরনের সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করে। এই নীতিগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবাহ এবং ধরনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে, যা রিকার্ডোর মডেলে অনুপস্থিত।
৭।উপকরণের গতিশীলতা মডেলটি ধরে নেয় যে শ্রম এবং পুঁজি দেশের অভ্যন্তরে সচল কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চল। বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে পুঁজি অত্যন্ত গতিশীল এবং শ্রমেরও আন্তর্জাতিক গতিশীলতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) এবং অভিবাসন একটি দেশের উৎপাদন কাঠামো এবং তুলনামূলক সুবিধা পরিবর্তন করে দিতে পারে। এই বাস্তবতাকে তত্ত্বটি ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
উপসংহার: রিকার্ডোর তুলনামূলক ব্যয় সুবিধা তত্ত্বের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এবং অবাস্তব অনুমতি থাকা সত্ত্বেও এর গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং দেখিয়েছে যে দেশগুলো কীভাবে বিশেষায়নের মাধ্যমে পারস্পরিকভাবে লাভবান হতে পারে। আধুনিক বাণিজ্য তত্ত্বগুলো, যেমন হেকশ্চার-ওলিন মডেল, এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে, যা এর ঐতিহাসিক এবং তাত্ত্বিক তাৎপর্যকে প্রমাণ করে।

