- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: রাষ্ট্রের গঠন ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে জাতিগত পরিচয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো রাষ্ট্রে বসবাসকারী জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে একজাতিক বা বহুজাতিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একজাতিক রাষ্ট্রে সাধারণত একটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর প্রাধান্য থাকে, অন্যদিকে বহুজাতিক রাষ্ট্রে একাধিক জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস দেখা যায়।
একজাতিক ও বহুজাতিক রাষ্ট্রের পার্থক্য:
১। জাতিগত বৈচিত্র্য: একজাতিক রাষ্ট্রে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে থাকে এবং তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মধ্যে অধিক মিল দেখা যায়। অন্যদিকে বহুজাতিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।
২। সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য: একজাতিক রাষ্ট্রে সাধারণত একটি প্রধান সংস্কৃতি রাষ্ট্রের সামাজিক জীবনে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। মানুষের আচার-অনুষ্ঠান, মূল্যবোধ ও জীবনধারায় অনেক মিল থাকে। বিপরীতে বহুজাতিক রাষ্ট্রে একাধিক সংস্কৃতির সহাবস্থান থাকে এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।
৩। ভাষার পার্থক্য: একজাতিক রাষ্ট্রে সাধারণত একটি প্রধান ভাষা জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং তা জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বহুজাতিক রাষ্ট্রে একাধিক ভাষার প্রচলন থাকতে পারে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে এবং ভাষাগত বৈচিত্র্য রাষ্ট্রের একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়।
৪। সামাজিক কাঠামো: একজাতিক রাষ্ট্রের সামাজিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে একরূপ হয়, কারণ জনগণের মধ্যে জাতিগত ও সাংস্কৃতিক মিল বেশি থাকে। অন্যদিকে বহুজাতিক রাষ্ট্রের সামাজিক কাঠামো বৈচিত্র্যময় হয়, যেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
৫। রাজনৈতিক ব্যবস্থা: একজাতিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে, কারণ জনগণের মধ্যে পরিচয়গত মিল বেশি থাকে। অন্যদিকে বহুজাতিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর স্বার্থ ও অধিকার বিবেচনা করে রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনা করতে হয়। তাই সেখানে ক্ষমতার বণ্টন ও প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৬। জাতীয় পরিচয়: একজাতিক রাষ্ট্রে জাতীয় পরিচয় সাধারণত একটি প্রধান জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। অন্যদিকে বহুজাতিক রাষ্ট্রে জাতীয় পরিচয় বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির সমন্বয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়। এখানে ঐক্য বজায় রাখতে সকল জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
৭। ঐক্য প্রতিষ্ঠা: একজাতিক রাষ্ট্রে জনগণের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতিগত মিল থাকার কারণে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা তুলনামূলক সহজ হয়। কিন্তু বহুজাতিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সমতার ভিত্তিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
৮। সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ: একজাতিক রাষ্ট্রে জাতিগত সংঘাতের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকে, কারণ জনগণের মধ্যে পরিচয়গত পার্থক্য কম। তবে বহুজাতিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অধিকার, স্বায়ত্তশাসন, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে মাঝে মাঝে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সঠিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
৯। প্রশাসনিক ব্যবস্থা: একজাতিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কারণ জনগণের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে মিল থাকে। অন্যদিকে বহুজাতিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনা করতে হয়, যাতে সকলের অধিকার নিশ্চিত হয়।
১০। উদাহরণের পার্থক্য: একজাতিক রাষ্ট্র হিসেবে সাধারণত এমন রাষ্ট্রকে বোঝানো হয় যেখানে একটি জাতিগোষ্ঠীর প্রাধান্য রয়েছে এবং সাংস্কৃতিক ঐক্য বেশি। অন্যদিকে বহুজাতিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। পৃথিবীর অনেক আধুনিক রাষ্ট্রেই একাধিক জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস রয়েছে।
উপসংহার: একজাতিক ও বহুজাতিক রাষ্ট্রের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো জনগণের জাতিগত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে। একজাতিক রাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে বেশি ঐক্য দেখা গেলেও বহুজাতিক রাষ্ট্রে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়। সুষ্ঠু নীতি, সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে উভয় ধরনের রাষ্ট্রই স্থিতিশীল ও উন্নত হতে পারে।