- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রারম্ভ: প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক এরিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তাঁর নাগরিকতা বিষয়ক তত্ত্ব। তাঁর মতে, রাষ্ট্র হলো এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন, যেখানে নাগরিকরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। নাগরিকতা কোনো জন্মগত বা সহজলভ্য অধিকার নয়, বরং এটি হলো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের একটি বিশেষ সুযোগ। এই নিবন্ধে আমরা এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বের মূল দিকগুলো সহজ ও আকর্ষণীয় ভাষায় আলোচনা করব।
এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্রের প্রতি একজন ব্যক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দায়িত্ববোধ। তিনি নাগরিককে কেবল রাষ্ট্রের একজন বাসিন্দা হিসেবে বিবেচনা করেননি, বরং এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখেছেন যিনি রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, বিচার ও প্রশাসনের সাথে সরাসরি জড়িত। এরিস্টটল মনে করতেন, নাগরিক হওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা প্রয়োজন। যেমন- বয়স, শিক্ষা, সম্পত্তি ইত্যাদি। তিনি নারী, দাস, শ্রমিক ও বিদেশিদের নাগরিক হিসেবে গণ্য করতেন না। তাঁর মতে, নাগরিকতা হলো একটি সম্মানজনক অবস্থান, যা শুধুমাত্র সেইসব ব্যক্তির জন্য সংরক্ষিত, যারা রাষ্ট্রের শাসনকার্যে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারেন। এরিস্টটলের এই ধারণা আধুনিক নাগরিকতার ধারণার থেকে ভিন্ন হলেও, এর মাধ্যমে আমরা প্রাচীন গ্রিক সমাজের রাষ্ট্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে জানতে পারি।
এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্য: -
১। সক্রিয় অংশগ্রহণের ধারণা: এরিস্টটলের মতে, নাগরিকতা কেবল রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে বসবাস করা নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক জীবন ও প্রশাসনিক কার্যাবলিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা। তিনি মনে করতেন, একজন প্রকৃত নাগরিক হলেন তিনিই যিনি আইন প্রণয়ন ও বিচারকার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাজে সরাসরি অংশ নেন। এই সক্রিয় অংশগ্রহণ কেবল ভোটের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এতে আইনসভা ও বিভিন্ন সরকারি পদে দায়িত্ব পালনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরিস্টটলের এই ধারণাটি আধুনিক গণতন্ত্রের অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থার ধারণার সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর মতে, নাগরিকের এই সক্রিয় অংশগ্রহণই একটি রাষ্ট্রকে সচল ও প্রাণবন্ত করে তোলে।
২। আইন প্রণয়ন ও বিচারকার্যে অংশগ্রহণ: এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, নাগরিকদের আইন প্রণয়ন এবং বিচারকার্যে অংশগ্রহণের সুযোগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন এবং বিচারব্যবস্থা যতটা কার্যকর হবে, রাষ্ট্র ততটাই উন্নত হবে। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তিনি কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর হাতে তুলে দিতে চাননি, বরং রাষ্ট্রের যোগ্য নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে চেয়েছেন। এরিস্টটল মনে করতেন, আইন প্রণয়ন ও বিচারকার্যের মতো সংবেদনশীল কাজগুলোতে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য বৃদ্ধি পাবে। এই অংশগ্রহণের ফলে নাগরিকরা রাষ্ট্রের আইন সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারে এবং আইনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়।
৩। সীমিত নাগরিকের ধারণা: এরিস্টটল তাঁর তত্ত্বের মাধ্যমে সীমিত নাগরিকের ধারণা দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রের সকল বাসিন্দা নাগরিক হতে পারে না। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের দাস, শ্রমিক, কারিগর, নারী এবং বিদেশি নাগরিকরা নাগরিক হিসেবে গণ্য হতে পারবে না। এর কারণ হলো, এই শ্রেণীর মানুষদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সারাদিন পরিশ্রম করতে হয়, যার ফলে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কার্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না। এরিস্টটলের এই ধারণাটি আধুনিক গণতন্ত্রের সার্বজনীন নাগরিকতার ধারণার সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই নাগরিক হিসেবে গণ্য হয়। তবে তাঁর এই ধারণাটি প্রাচীন গ্রিক সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।
৪। সম্পত্তি ও অবসর সময়ের প্রয়োজনীয়তা: এরিস্টটল মনে করতেন, নাগরিক হওয়ার জন্য যথেষ্ট সম্পত্তি এবং অবসর সময় থাকা অপরিহার্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে ব্যক্তির জীবিকা নির্বাহের জন্য সারাক্ষণ কাজ করতে হয়, তার পক্ষে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কার্যাবলিতে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই শুধুমাত্র সেইসব ব্যক্তিই নাগরিক হতে পারে, যাদের সম্পত্তি রয়েছে এবং যারা পর্যাপ্ত অবসর সময় পায়। এই অবসর সময়কে তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কার্যে অংশগ্রহণের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতেন। এরিস্টটলের মতে, সম্পত্তি ব্যক্তিকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দেয়, যার ফলে সে রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়িত্ব পালনে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারে। এই ধারণাটি সেই সময়ের গ্রিক সমাজে প্রচলিত অভিজাত শ্রেণীর রাজনৈতিক আধিপত্যকে তুলে ধরে।
৫। নৈতিক ও বুদ্ধিভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা: এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নৈতিক ও বুদ্ধিভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের উপর জোর দেওয়া। তিনি মনে করতেন, একজন প্রকৃত নাগরিক হওয়ার জন্য শুধু অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বা অবসর সময় থাকলেই হবে না, বরং তাকে নৈতিক ও বুদ্ধিগতভাবেও উন্নত হতে হবে। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও বিচারকার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উচ্চ নৈতিক মান এবং বিচার-বিবেচনাবোধ থাকা জরুরি। এরিস্টটল বিশ্বাস করতেন, নৈতিক এবং বুদ্ধিমান নাগরিকরা একটি রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যাণে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে। তাই তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভালো গুণাবলী বিকাশের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, যা একটি সুস্থ ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনে সাহায্য করবে।
৬। নাগরিকের জন্মগত অধিকারের বিরোধিতা: এরিস্টটল বিশ্বাস করতেন না যে, নাগরিকতা একটি জন্মগত অধিকার। তিনি মনে করতেন, কেউ একটি রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলেই সে নাগরিক হয়ে যায় না। বরং নাগরিকতা অর্জনের জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, নাগরিকতা হলো একটি সম্মানজনক অবস্থান যা শুধুমাত্র সেইসব যোগ্য ব্যক্তির জন্য সংরক্ষিত, যারা রাষ্ট্রের কল্যাণে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। এরিস্টটলের এই দৃষ্টিভঙ্গিটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্মগত নাগরিকত্বের ধারণার সাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি মনে করতেন, যদি নাগরিকতাকে একটি জন্মগত অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কার্যক্রমে অযোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ তৈরি হবে, যা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
৭। নাগরিক ও বাসিন্দার মধ্যে পার্থক্য: এরিস্টটল তাঁর নাগরিকতা তত্ত্বে নাগরিক এবং সাধারণ বাসিন্দার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করেছেন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী সবাই নাগরিক নয়। একজন সাধারণ বাসিন্দা কেবল তার দৈনন্দিন জীবন যাপন করে এবং রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন মেনে চলে। কিন্তু একজন নাগরিক হলেন তিনি যিনি সক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজে অংশ নেন। এরিস্টটলের এই পার্থক্যটি সেই সময়ের গ্রিক সমাজের রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রতিফলিত করে, যেখানে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতা শুধুমাত্র একটি বিশেষ শ্রেণীর হাতে ছিল। তাঁর মতে, এই পার্থক্যটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের জন্য অপরিহার্য, কারণ এটি নিশ্চিত করে যে শুধুমাত্র যোগ্য ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবে।
৮। রাজনৈতিক সমাজের সদস্য হিসেবে নাগরিক: এরিস্টটলের মতে, মানুষ একটি রাজনৈতিক প্রাণী এবং তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য একটি রাজনৈতিক সমাজের সদস্য হওয়া অপরিহার্য। তিনি মনে করতেন, নাগরিকরা কেবল রাষ্ট্রের অংশ নয়, বরং তারা রাজনৈতিক সমাজের সক্রিয় সদস্য। এই রাজনৈতিক সমাজের সদস্য হিসেবে নাগরিকরা একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে এবং রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করে। এরিস্টটলের এই ধারণাটি আধুনিক সমাজবিজ্ঞানেও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ব্যক্তিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই রাজনৈতিক সমাজের সদস্য হওয়ার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার নৈতিক ও বুদ্ধিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারে।
৯। আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্য: এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনের শাসনের প্রতি গভীর আনুগত্য। তিনি মনে করতেন, একজন প্রকৃত নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের আইনকে মেনে চলা এবং তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এরিস্টটল বিশ্বাস করতেন, আইন একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং আইনের শাসনের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্র সুশৃঙ্খল এবং স্থিতিশীল থাকে। তিনি মনে করতেন, যদি নাগরিকরা আইনকে সম্মান না করে, তাহলে রাষ্ট্রের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে এবং রাষ্ট্র তার কার্যকারিতা হারাবে। তাই তিনি নাগরিকদেরকে শুধু আইন মেনে চলার কথা বলেননি, বরং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।
১০। নাগরিকের কর্তব্য ও অধিকারের সম্পর্ক: এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, নাগরিকের অধিকার এবং কর্তব্য একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিনি মনে করতেন, একজন নাগরিক কেবল অধিকার ভোগ করবে না, বরং তার কিছু নির্দিষ্ট কর্তব্যও থাকবে। এরিস্টটলের মতে, এই কর্তব্যগুলো হলো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কার্যাবলিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কর্তব্য পালন করার মাধ্যমেই একজন নাগরিক তার অধিকার ভোগ করার যোগ্যতা অর্জন করে। এরিস্টটলের এই ধারণাটি আধুনিক নাগরিকতার ধারণার থেকে ভিন্ন, যেখানে অধিকার এবং কর্তব্যকে প্রায়শই আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই ধারণাটি একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
১১। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য: এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বের মূল লক্ষ্য ছিল একটি সুশৃঙ্খল এবং সুশাসিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, যদি নাগরিকরা যোগ্য হয় এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, তাহলে একটি রাষ্ট্র সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। এরিস্টটল মনে করতেন, অযোগ্য বা অশিক্ষিত নাগরিকদের হাতে যদি রাষ্ট্রের ক্ষমতা চলে যায়, তাহলে রাষ্ট্র বিশৃঙ্খল এবং অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। তাই তিনি নাগরিকতাকে একটি সম্মানজনক ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রদত্ত অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করতেন, যা শুধুমাত্র সেইসব ব্যক্তিকে দেওয়া উচিত যারা রাষ্ট্রের কল্যাণে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে।
১২। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের ধারণা: এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রের প্রতি গভীর আনুগত্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন প্রকৃত নাগরিক হলেন তিনি যিনি রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত এবং রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করতে প্রস্তুত। এরিস্টটল মনে করতেন, এই আনুগত্য কেবল নিয়ম-কানুন মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতি একটি গভীর ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধের অনুভূতি। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনের জন্য অপরিহার্য। এরিস্টটলের এই ধারণাটি সেই সময়ের গ্রিক সমাজে প্রচলিত দেশপ্রেমের ধারণাকে প্রতিফলিত করে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যকে সর্বোচ্চ নৈতিক গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
১৩। গণতন্ত্রের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি: এরিস্টটল যদিও নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা বলেছেন, তবুও তিনি গণতন্ত্রের কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি মনে করতেন, গণতন্ত্রে অযোগ্য এবং অশিক্ষিত মানুষরা ক্ষমতায় আসতে পারে, যা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এরিস্টটলের মতে, যদি নাগরিকতা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কার্যক্রমে অযোগ্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করবে, যা রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলবে। তাই তিনি একটি সীমিত নাগরিকত্বের ধারণাকে সমর্থন করতেন, যেখানে শুধুমাত্র যোগ্য এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবে। এরিস্টটলের এই সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিটি সেই সময়ের গ্রিক সমাজের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।
১৪। রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য নাগরিকদের ভূমিকা: এরিস্টটল মনে করতেন, একটি রাষ্ট্রের উন্নতি নির্ভর করে তার নাগরিকদের গুণাবলী এবং অংশগ্রহণের উপর। তিনি বিশ্বাস করতেন, যদি নাগরিকরা শিক্ষিত, নৈতিক এবং বুদ্ধিমান হয়, তাহলে রাষ্ট্রও উন্নত হবে। এরিস্টটলের মতে, নাগরিকরা শুধু রাষ্ট্রের সুবিধা ভোগ করবে না, বরং তাদের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য কাজ করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, নাগরিকরা যদি তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তাহলে রাষ্ট্র তার কার্যকারিতা হারাবে। তাই তিনি নাগরিকদেরকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।
১৫। নাগরিকতার মানদণ্ড: এরিস্টটল নাগরিকতা নির্ধারণের জন্য কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলেন। এই মানদণ্ডগুলোর মধ্যে ছিল বয়স, শিক্ষা, সম্পত্তি এবং অবসর সময়। তিনি মনে করতেন, একজন ব্যক্তিকে নাগরিক হওয়ার জন্য এই মানদণ্ডগুলো পূরণ করতে হবে। এরিস্টটলের মতে, এই মানদণ্ডগুলো নিশ্চিত করে যে শুধুমাত্র সেইসব ব্যক্তিরাই নাগরিক হবে যারা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য। এই মানদণ্ডগুলো সেই সময়ের গ্রিক সমাজের অভিজাত শ্রেণীর রাজনৈতিক আধিপত্যকে প্রতিফলিত করে, যেখানে ক্ষমতা এবং সুযোগ-সুবিধা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর হাতে ছিল।
১৬। রাজনৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব: এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বে রাজনৈতিক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তিনি মনে করতেন, একজন প্রকৃত নাগরিককে রাষ্ট্রের আইন, শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। এরিস্টটল বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক শিক্ষা একজন নাগরিককে রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে এবং তাকে একজন যোগ্য ও বুদ্ধিমান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি মনে করতেন, যদি নাগরিকরা রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত না হয়, তাহলে তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করতে পারে, যা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। তাই তিনি নাগরিকদের জন্য রাজনৈতিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার কথা বলেছিলেন।
১৭। নৈতিক জীবনের লক্ষ্য: এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বের একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল নাগরিকদের মধ্যে একটি নৈতিক জীবন প্রতিষ্ঠা করা। তিনি মনে করতেন, একটি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো তার নাগরিকদেরকে একটি উন্নত ও নৈতিক জীবন যাপন করতে সাহায্য করা। এরিস্টটল বিশ্বাস করতেন, নাগরিকরা যদি নৈতিকভাবে উন্নত হয়, তাহলে তারা রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করতে আরও বেশি আগ্রহী হবে এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। তিনি মনে করতেন, নাগরিকতা কেবল রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নয়, বরং এটি হলো একটি নৈতিক জীবন যাপনের উপায়, যা ব্যক্তিকে তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশে সাহায্য করে।
উপসংহার: এরিস্টটলের নাগরিকতা তত্ত্বটি প্রাচীন গ্রিক সমাজের একটি প্রতিফলন। যদিও তাঁর কিছু ধারণা, যেমন- সীমিত নাগরিকত্ব এবং নারী ও দাসের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক গণতন্ত্রের সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত, তবুও তাঁর তত্ত্বের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং উন্নতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এরিস্টটলের এই তত্ত্বটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং আজও এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। তাঁর এই তত্ত্বের মাধ্যমে আমরা নাগরিকতার প্রকৃত অর্থ এবং একটি সুস্থ রাষ্ট্র গঠনের জন্য নাগরিকদের ভূমিকার গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারি।

