- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রারম্ভ: একটি দেশের সুশাসন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকার বলতে সেই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়, যা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ সরকার ও এর শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে তিনি সরকারের বিস্তারিত শ্রেণিবিন্যাস তুলে ধরেছেন।
এরিস্টটলের সরকারের শ্রেণিবিন্যাস
এরিস্টটল সরকারের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন দুটি প্রধান মানদণ্ডের ভিত্তিতে:
- ক. সংখ্যা: কে বা কতজন শাসন করে তার ওপর ভিত্তি করে।
- খ. উদ্দেশ্য: শাসকের উদ্দেশ্য ভালো না মন্দ তার ওপর ভিত্তি করে।
অতএব, এরিস্টটল সরকারকে ৬টি ভাগে বিভক্ত করেছেন, যা নিম্নরূপ: –
১. রাজতন্ত্র (Monarchy):
- সংখ্যা: একজন মাত্র শাসক শাসন করেন।
- উদ্দেশ্য: শাসকের প্রধান লক্ষ্য হলো জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
- উদাহরণ: এরিস্টটল মনে করতেন, আদর্শ রাজা প্রজ্ঞা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করেন।
রাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য: এরিস্টটলের মতে রাজতন্ত্র হল একজন গুণবান ও যোগ্য ব্যক্তির শাসনব্যবস্থা যেখানে শাসকের প্রধান লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। এই ব্যবস্থায় শাসক নৈতিকতা, জ্ঞান ও দক্ষতায় শ্রেষ্ঠ হন এবং সমাজে স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখেন। তবে এরিস্টটল সতর্ক করেছিলেন যে যদি উত্তরাধিকারী অযোগ্য হন তবে এই ব্যবস্থা স্বৈরতন্ত্রে রূপ নিতে পারে। আদর্শ রাজতন্ত্রের উদাহরণ হিসেবে প্রাচীন ভারতের রাজা রামচন্দ্র বা গ্রিক কিংবদন্তি শাসকদের উল্লেখ করা যায়।
২. অভিজাততন্ত্র (Aristocracy):
- সংখ্যা: একটি ছোট অভিজাত গোষ্ঠী শাসন করে।
- উদ্দেশ্য: শাসকরা নিজেদের স্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন।
- উদাহরণ: এই ধরনের সরকারে জ্ঞানী, গুণী ও সৎ ব্যক্তিরা শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
অভিজাততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য: এরিস্টটলের মতে অভিজাততন্ত্র হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে সমাজের সর্বোত্তম, নীতিবান ও গুণী ব্যক্তিরা সংখ্যালঘু হিসেবে ক্ষমতা পরিচালনা করেন। এই ব্যবস্থায় শাসকগণ জ্ঞান, নৈতিকতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হন এবং তাদের মূল লক্ষ্য থাকে সমাজের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। অভিজাততন্ত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জনগণের মঙ্গলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে এরিস্টটল সতর্ক করেছিলেন যে যদি এই শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহার শুরু করে তবে তা ধীরে ধীরে ওলিগার্কিতে পরিণত হতে পারে। আদর্শ অবস্থায় এটি একটি সুষম ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩. পলিটি (Polity):
- সংখ্যা: একটি বড়ো গোষ্ঠী বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি শাসন করে।
- উদ্দেশ্য: এটি একটি মিশ্র সরকার, যেখানে জনগণের কল্যাণই প্রধান লক্ষ্য।
- উদাহরণ: এরিস্টটলের মতে, এটি হলো শ্রেষ্ঠ সরকার। এটি রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের সুবিধাগুলোকে একত্রিত করে এবং এটি হলো গণতান্ত্রিক ও অভিজাত শাসনের সংমিশ্রণ।
পলিটির বৈশিষ্ট্য: এরিস্টটলের মতে পলিটি হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে একটি ভারসাম্যপূর্ণ শাসনব্যবস্থা যা রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মিশ্রণে গঠিত। এটি ধনী ও দরিদ্রের চরমপন্থা এড়িয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। পলিটিতে আইনের শাসন প্রাধান্য পায় এবং শাসকগণ যোগ্যতা ও নৈতিকতাভিত্তিক নেতৃত্ব দেন। এরিস্টটল একে সর্বোত্তম সরকার মনে করতেন কারণ এটি ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে সাধারণ কল্যাণ নিশ্চিত করে এবং অস্থিরতা থেকে মুক্ত। পলিটি সংবিধানিক কাঠামোয় পরিচালিত হয় বলে এটি দীর্ঘস্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত শাসন প্রদান করে।
৪. স্বৈরতন্ত্র (Tyranny):
- সংখ্যা: একজন মাত্র শাসক শাসন করে।
- উদ্দেশ্য: শাসকের প্রধান লক্ষ্য হলো নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণ করা।
- উদাহরণ: এটি রাজতন্ত্রের বিকৃত রূপ, যেখানে স্বৈরাচারী শাসক জনগণের ওপর অত্যাচার করে।
স্বৈরতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য: এরিস্টটলের মতে স্বৈরতন্ত্র হলো রাজতন্ত্রের বিকৃত রূপ যেখানে একজন শাসক কেবল নিজের স্বার্থে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এই ব্যবস্থায় শাসক জনগণের কল্যাণের বদলে ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও সুবিধা অর্জনকে প্রাধান্য দেয়। স্বৈরাচারী শাসক সাধারণত জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল করে এবং নিষ্ঠুরতা ও অত্যাচারের মাধ্যমে শাসন করে। এরিস্টটল মনে করতেন স্বৈরতন্ত্র সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা কারণ এতে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার উপেক্ষিত হয়। স্বৈরশাসক প্রজাদের সম্পদ লুট করে ও বিরোধীদের দমন করে শাসন টিকিয়ে রাখে।
৫. অলিগার্কি (Oligarchy):
- সংখ্যা: একটি ছোট ধনী গোষ্ঠী শাসন করে।
- উদ্দেশ্য: শাসকরা শুধু নিজেদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি ও স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কাজ করে।
- উদাহরণ: এটি অভিজাততন্ত্রের বিকৃত রূপ।
অলিগার্কির বৈশিষ্ট্য: এরিস্টটলের মতে অলিগার্কি হলো একটি বিকৃত সরকার ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা কেবল ধনী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। এই ব্যবস্থায় শাসকগণ সাধারণ মানুষের কল্যাণের বদলে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যস্ত থাকে। সম্পদের অসম বণ্টন ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা কয়েকজনের হাতে কুক্ষিগত হয় ফলে সমাজে বৈষম্য ও অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। এরিস্টটল অলিগার্কিকে অস্থিতিশীল ও অন্যায় হিসেবে বিবেচনা করেন কারণ এটি ন্যায়বিচার ও সাম্যের পরিবর্তে শোষণকে প্রাধান্য দেয়।
৬. গণতন্ত্র (Democracy):
- সংখ্যা: দরিদ্রদের একটি বড়ো গোষ্ঠী শাসন করে।
- উদ্দেশ্য: শাসকের প্রধান লক্ষ্য হলো শুধু নিজেদের স্বার্থ পূরণ করা এবং ধনীদের ওপর অত্যাচার করা।
- উদাহরণ: এরিস্টটল ‘গণতন্ত্র’ বলতে বর্তমানের প্রতিনিধিমূলক গণতন্ত্র বোঝাননি, বরং জনতা বা দরিদ্রদের শাসনকে বোঝাতে চেয়েছেন, যা ছিল তার চোখে খারাপ ও স্বার্থপর। এটি পলিটির বিকৃত রূপ।
গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য: এরিস্টটলের মতে গণতন্ত্র এমন একটি সরকার ব্যবস্থা যেখানে দরিদ্র ও সাধারণ জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করে। এটি সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয় কিন্তু এরিস্টটল একে একটি বিকৃত শাসনব্যবস্থা হিসেবে দেখেছেন কারণ এখানে অশিক্ষিত ও আবেগপ্রবণ জনগণ যুক্তিহীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে যা সামগ্রিক কল্যাণের বদলে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তিনি মনে করতেন গণতন্ত্রে গরিবরা ধনীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে চায় যা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে। এরিস্টটলের বিবেচনায় এটি পলিটির চেয়ে নিকৃষ্ট একটি ব্যবস্থা।

