- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: সমাজের গঠন, স্থায়িত্ব এবং পরিবর্তনশীলতা বোঝার জন্য কাঠামো কার্যগত পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি মূলত সমাজকে একটি জীবন্ত দেহের সঙ্গে তুলনা করে, যেখানে প্রতিটি অঙ্গ (প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী, ব্যক্তি) নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে এবং একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, সমাজের কোনো একটি অংশের কার্যকারিতায় সমস্যা দেখা দিলে তা সমগ্র ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।J
শাব্দিক অর্থ: ‘কাঠামো’ শব্দটি ইংরেজি ‘Structure’ থেকে এসেছে, যা কোনো ব্যবস্থার গঠন বা অংশগুলোর সাজানোকে বোঝায়। ‘কার্যগত’ হলো ‘Functional’-এর অনুবাদ, যা কোনো অংশের কাজ বা উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে। একসাথে এটি একটি পদ্ধতি যা কোনো সিস্টেমের গঠন এবং তার কার্যাবলীকে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করে।
সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কাঠামো কার্যগত পদ্ধতি (Structural Functionalism) একটি প্রভাবশালী তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজ একটি জটিল ব্যবস্থা যা বিভিন্ন পরস্পর নির্ভরশীল অংশ নিয়ে গঠিত। এই অংশগুলো হলো পরিবার, ধর্ম, রাষ্ট্র, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি ইত্যাদি। প্রতিটি অংশের একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা বা কাজ (Function) আছে যা সামগ্রিক সামাজিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতিটি সমাজের উপাদানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাদের কার্যকারিতার ওপর জোর দেয়।
সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই ধারণাটি বিভিন্ন মনীষী ও গবেষকের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। নিচে তাদের কিছু উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা দেওয়া হলো:
১। গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ড (Gabriel Almond): রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তিনি এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করেন। তাঁর মতে, প্রতিটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার কিছু নির্দিষ্ট কাঠামো (যেমন আইনসভা, আদালত) থাকে এবং এই কাঠামোরা কিছু নির্দিষ্ট কার্য (যেমন আইন প্রণয়ন, বিচার) সম্পাদন করে যা সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সচল রাখে। (In political science, he applied this approach. According to him, every political system has certain structures (like the legislature, courts) and these structures perform specific functions (like lawmaking, justice) that keep the overall political system running.)
২। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): তিনি বলেছেন যে সমাজের প্রতিটি অংশ একটি নির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন করে যা সামগ্রিক সমাজের স্থিতিশীলতা ও সংহতি বজায় রাখে। (“Society is a system of interrelated parts where each part contributes to the stability and functioning of the whole.”)
৩। ট্যালকট পারসন্স (Talcott Parsons): পারসন্সের মতে, সমাজ একটি জীবন্ত দেহের মতো, যার বেঁচে থাকা ও সুষ্ঠুভাবে কাজ করার জন্য এর বিভিন্ন সাংগঠনিক কাঠামোর নির্দিষ্ট কার্যাবলী সম্পাদন অত্যাবশ্যক। (“Social structures exist to perform specific functions that are necessary for the maintenance of the social system as a whole.”)
৪। . হারবার্ট স্পেনসার (Herbert Spencer): তিনি সমাজের সাথে একটি জীবন্ত দেহের তুলনা করেন, যেখানে বিভিন্ন অঙ্গ (কাঠামো) বিভিন্ন কাজ (কার্য) সম্পাদনের মাধ্যমে সামগ্রিক দেহটিকে সচল রাখে। (“Society is akin to a biological organism where social structures work together to maintain the whole.”)
৫। অগবার্ন (Ogburn) ও নিমকফ (Nimkoff): তাঁদের মতে, সামাজিক কাঠামো হলো সেই সম্পর্কের জাল যা ব্যক্তিদেরকে একত্রে বেঁধে রাখে এবং এর মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন চাহিদা পূরণের কাজগুলো সম্পাদিত হয়। (“Social structure is the pattern of inter-relations of persons… and function is the consequent effect upon the society.”)
৬। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte): তিনি সমাজকে একটি জৈবনিক সত্তা হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে প্রতিটি অংশ (বা প্রতিষ্ঠান) সামগ্রিক সুস্থিরতা বজায় রাখার জন্য কাজ করে। এই ধারণার মাধ্যমে তিনি সামাজিক সংহতির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। (He viewed society as an organic entity, where each part (or institution) works to maintain overall stability. Through this concept, he emphasized the need for social cohesion.)
৭। অ্যারিস্টটল: রাষ্ট্রকে একটি জৈবিক সত্তা হিসেবে দেখা, যার অংশগুলো একসাথে কাজ করে সামগ্রিক ভালোর জন্য। (The state is viewed as an organic entity, where parts work together for the overall good.)
৮। প্লেটো: সমাজকে একটি জৈবিক কাঠামো হিসেবে বর্ণনা, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর ফাংশন সামগ্রিক সংহতি বজায় রাখে। (Society is described as an organic structure, where different classes perform functions to maintain overall harmony.)
৯। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): হান্টিংটন রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি দেখান যে রাজনৈতিক কাঠামোগুলো যদি কার্যকর না হয়, তাহলে সমাজে অস্থিতিশীলতা বা রাজনৈতিক ক্ষয় দেখা দিতে পারে। (Huntington discussed the functioning and stability of political systems. He showed that if political structures are not effective, instability or political decay can occur in society.)
কাঠামো কার্যগত পদ্ধতি হলো এমন একটি তত্ত্ব যা সমাজকে একটি সুসংহত ও জটিল ব্যবস্থা হিসেবে দেখে, যেখানে সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উপাদান (যেমন পরিবার, রাষ্ট্র, ধর্ম, অর্থনীতি) একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থেকে নিজেদের ভূমিকা পালন করে। এই ভূমিকাগুলো একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করে সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্য রক্ষা করে।
উপসংহার: সরল ভাষায়, কাঠামোগত কার্যগত পদ্ধতি হল একটি চশমা বা লেন্স যার মাধ্যমে আমরা দেখি যে, একটি বড় ব্যবস্থার ছোট ছোট অংশগুলো কীভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে সামগ্রিকভাবে একটি লক্ষ্য অর্জন করে। এটি শুধু তাত্ত্বিক আলোচনাই নয়, বরং বাস্তব বিশ্বে সংগঠন, সরকার ও সমাজকে আরও ভালোভাবে বোঝার এবং এর সাফল্য বা ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
কাঠামো কার্যগত পদ্ধতি হলো একটি তত্ত্ব যা সমাজের বিভিন্ন কাঠামোর (প্রতিষ্ঠান) কার্যকারিতা ও তাদের পারস্পরিক নির্ভরতার মাধ্যমে সামাজিক ভারসাম্য বোঝার চেষ্টা করে।
১৯৪০ এবং ১৯৫০-এর দশকে এই তত্ত্বটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই সময়কালের গবেষণায় দেখা যায় যে, ১৯৫০ সালের আমেরিকার পরিবার জরিপ অনুযায়ী, ৫০% এরও বেশি পরিবারে একক উপার্জনকারী ছিল, যা পরিবার কাঠামোর একটি নির্দিষ্ট কার্যগত ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানেও এর প্রয়োগ দেখা যায়, যেমন ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত অ্যালমন্ড ও পাওয়েলের “Comparative Politics: A Developmental Approach” বইয়ে। এই তত্ত্ব রাজনৈতিক কাঠামোগুলোর কার্যকারিতার উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনা ও বিশ্লেষণ করে।

