- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার আইনসভা। বাংলাদেশে কার্যকর জাতীয় সংসদ সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র হলেও দীর্ঘ পথচলায় এটি নানা প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। একটি গতিশীল, জবাবদিহিমূলক এবং শক্তিশালী সংসদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রধান অন্তরায়সমূহ নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
বাংলাদেশে কার্যকর জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায়সমূহ:
১। রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব: বাংলাদেশে কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায় হলো পরমতসহিষ্ণু ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির তীব্র অভাব। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং চরম মেরুকরণ সংসদকে একটি গঠনমূলক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হতে দেয় না। এখানে বিরোধী দলকে শত্রু ভাবার প্রবণতা রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী। ফলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
২। ৭০ অনুচ্ছেদের বাধা: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়া বা স্বাধীন মতামত প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। এর ফলে কোনো সংসদ সদস্য দলের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে পারেন না। এটি মূলত আইনপ্রণেতাদের বিবেকের স্বাধীনতাকে বন্দী করে এবং সংসদকে কার্যক্ষেত্রে কেবল দলের সিদ্ধান্তের রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত করে। এই ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রচর্চা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
৩। সংসদ বয়কটের সংস্কৃতি: বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধী দলগুলোর সংসদ বর্জন বা বয়কট করার সংস্কৃতি একটি বড় ব্যাধি। নিয়মিত সংসদ অধিবেশনে যোগ না দিয়ে রাজপথে আন্দোলন করাকে দলগুলো বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এর ফলে জনগণের প্রকৃত সমস্যাগুলো সংসদে আলোচিত হতে পারে না এবং সংসদের কার্যকারিতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। সংসদীয় বিতর্ক ছাড়া একতরফাভাবে আইন পাস হওয়ায় গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়।
৪। কার্যনির্বাহী বিভাগের প্রাধান্য: আমাদের দেশে সংসদীয় ব্যবস্থার নামে কার্যত কার্যনির্বাহী বিভাগ বা সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকে। সংসদ যেখানে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে, সেখানে উল্টো সরকারই সংসদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ক্ষমতার এই চরম ভারসাম্যহীনতার কারণে সংসদ একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের মর্যাদা ধরে রাখতে পারে না। ফলস্বরূপ, আইনসভার ওপর নির্বাহী বিভাগের অযাচিত হস্তক্ষেপ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পায়।
৫। দুর্বল স্থায়ী কমিটি: সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে সংসদের চোখ ও কান বলা হলেও বাংলাদেশে এগুলো অত্যন্ত দুর্বল ও নিষ্ক্রিয়। অনেক ক্ষেত্রে কমিটিগুলোর সভাপতি পদে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা থাকায় তারা মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করেন। নিয়মিত বৈঠক না হওয়া এবং কমিটির সুপারিশগুলো সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবায়ন না করার প্রবণতা প্রবল। ফলে ministries বা মন্ত্রণালয়ের ওপর সংসদের যে আর্থিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা, তা খর্ব হয়।
৬। আইনপ্রণেতাদের দক্ষতার ঘাটতি: নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশের সংসদীয় কার্যপ্রণালী, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং সংবিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান বা দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। সংসদে তারা গঠনমূলক বিতর্কে অংশ নেওয়ার চেয়ে দলীয় নেতার গুণগানে বেশি সময় ব্যয় করেন। আইন প্রণয়নের মতো জটিল ও সংবেদনশীল কাজে যথাযথ ভূমিকা রাখার মতো পড়াশোনা বা আগ্রহ অনেকেরই থাকে না। এই গুণগত দক্ষতার অভাব কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
৭। রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ: বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসেবা বা সমাজকল্যাণের চেয়ে ব্যবসা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করাই অনেকের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সংসদে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইনের চেয়ে কর রেয়াত বা ব্যবসায়ী বান্ধব নীতি তৈরিতে বেশি উৎসাহ দেখা যায়। সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা বলার মতো নিঃস্বার্থ ও ত্যাগী রাজনীতিবিদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
৮। সহিংস রাজপথের রাজনীতি: বাংলাদেশে দাবি আদায়ের মূল কেন্দ্র হিসেবে সংসদকে ব্যবহার না করে রাজপথের সহিংসতাকে বেছে নেওয়া হয়। হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও এবং ব্লকেডের মতো কর্মসূচি সংসদীয় রাজনীতির গুরুত্বকে চরমভাবে হ্রাস করে দেয়। দলগুলো যখন সংসদের ফ্লোর ছেড়ে রাস্তায় শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত থাকে, তখন সংসদ তার কার্যকারিতা হারায়। এই নেতিবাচক প্রবণতা সাধারণ জনগণকে সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি চরমভাবে অনীহাগ্রস্ত ও হতাশ করে তোলে।
৯। স্পিকারের নিরপেক্ষতার সংকট: সংসদের অভিভাবক হিসেবে স্পিকারের পদটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হওয়া বাঞ্ছনীয় হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কম দেখা যায়। স্পিকার সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হওয়ায় দলের প্রতি তার এক ধরণের আনুগত্য কাজ করে। অনেক সময় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া বা তাদের নোটিশ উপেক্ষা করার অভিযোগ ওঠে। স্পিকারের এই প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করার পথে বড় বাধা।
১০। কার্যপ্রণালী বিধির অপপ্রয়োগ: জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রায়শই বড় ধরণের সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। বিরোধী দলের আনা জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বা নোটিশগুলো বিধিগত কারণ দেখিয়ে অধিকাংশ সময়ই খারিজ করে দেওয়া হয়। অথচ সরকারি দলের সদস্যদের অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যকেও দীর্ঘ সময় ধরে সংসদে চলতে দেওয়া হয়। নিয়মের এই পক্ষপাতমূলক আচরণ সংসদের স্বাভাবিক ভারসাম্য ও কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
১১। জনপ্রতিনিধিত্বের অভাব: ত্রুটিপূর্ণ বা একতরফা নির্বাচনের কারণে সংসদে অনেক সময় জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট বা প্রতিনিধিত্ব প্রতিফলিত হয় না। ভোটারবিহীন বা কম ভোটার উপস্থিতির নির্বাচনে জয়ী হয়ে যারা সংসদে আসেন, তাদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে না। যখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই, তখন সংসদের প্রতি তাদের আস্থা সম্পূর্ণ চলে যায়। এই প্রতিনিধিত্বের সংকট সংসদকে একটি অকার্যকর ও ভিত্তিহীন প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়।
১২। আমলাতন্ত্রের আধিপত্য: সরকারের নীতি নির্ধারণ এবং সংসদীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমলাদের অতিরিক্ত প্রভাব কার্যকর সংসদের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা আমলাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা তাদের নিজস্ব কর্তৃত্বকে দুর্বল করে। সংসদীয় কমিটির তলব বা কৈফিয়তের জবাব দিতেও আমলারা অনেক সময় গড়িমসি বা অবহেলা প্রদর্শন করেন। আমলাতন্ত্রের এই অনড় অবস্থান জনপ্রতিনিধিদের কার্যকারিতাকে সম্পূর্ণ সংকুচিত করে ফেলে।
১৩। বাজেট পাসের আনুষ্ঠানিকতা: বাংলাদেশের সংসদে জাতীয় বাজেট পেশের পর তা নিয়ে বিস্তারিত ও চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত কম সময় দেওয়া হয়। বিশাল অঙ্কের এই বাজেটের প্রতিটি খাতের যৌক্তিকতা নিয়ে সংসদ সদস্যরা গভীরভাবে আলোচনা করার সুযোগ বা যোগ্যতা পান না। অধিকাংশ সময়ই কোনো প্রকার বড় ধরণের সংশোধন ছাড়াই গড্ডালিকা প্রবাহে বাজেট পাস হয়ে যায়। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে সংসদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে না।
১৪। স্বচ্ছতার ঘাটতি: সংসদের ভেতরে কী ঘটছে, কীভাবে আইন পাস হচ্ছে এবং সংসদ সদস্যরা কী ভূমিকা রাখছেন তা জনগণের কাছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নয়। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকগুলো সাধারণত রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার থাকে না। তথ্যের এই গোপনীয়তার কারণে জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির কার্যক্রম মূল্যায়ন করার সুযোগ পায় না। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার এই অভাব সংসদকে একটি রুদ্ধশ্বাস ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে।
১৫। দুর্বল গবেষণা সেল: আইন প্রণয়নের মতো জটিল বিষয়ে সংসদ সদস্যদের তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার জন্য শক্তিশালী কোনো গবেষণা সেল নেই। উন্নত বিশ্বে সংসদ লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রগুলো আইনপ্রণেতাদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নিরপেক্ষ তথ্য ও পরিসংখ্যান সরবরাহ করে থাকে। আমাদের দেশে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব থাকায় সংসদ সদস্যরা বাস্তবসম্মত ও তথ্যবহুল বক্তব্য দিতে পারেন না। ফলে সংসদের বিতর্কের মান অত্যন্ত নিম্নমুখী ও একঘেয়ে রয়ে যায়।
১৬। সুশীল সমাজের দূরত্ব: বাংলাদেশের সংসদীয় কার্যক্রমে নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজের মতামত গ্রহণের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রেওয়াজ গড়ে ওঠেনি। আইন প্রণয়নের আগে অংশীজন বা বিশেষজ্ঞদের সাথে উন্মুক্ত আলোচনার সংস্কৃতি এখানে নেই বললেই চলে। সংসদ নিজেদের এক ধরণের আইসোলেশনের মধ্যে রেখে সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এই জনবিচ্ছিন্নতা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের অভাব সংসদের তৈরি আইনের কার্যকারিতা এবং গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করে দেয়।
১৭। জনগণের উদাসীনতা: সংসদীয় গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সচেতনতা অপরিহার্য হলেও আমাদের দেশে তার তীব্র অভাব রয়েছে। সংসদের কার্যক্রম বা আইন প্রণয়ন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের দীর্ঘমেয়াদী উদাসীনতা ও হতাশা কাজ করে। ভোটাররা সংসদ সদস্যদের এলাকার উন্নয়নমূলক কাজের ঠিকাদার মনে করেন, আইনপ্রণেতা হিসেবে নয়। জনগণের এই ভুল ধারণা এবং চাপের অভাব সংসদকে আরও বেশি অকার্যকর ও অলস করে তোলে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠা করা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই এই প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোকে সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংসদের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চাকে বেগবান করতে হবে। তবেই সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে জাতীয় সংসদ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।