- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভারসাম্য রক্ষার কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, শাসন বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ক্যাবিনেট বা মন্ত্রিসভা—প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এর ফলে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে তারা এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে, যা ‘ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব’ নামে পরিচিত। এই ধারণাটি আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত।
শাব্দিক অর্থ: ‘ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো মন্ত্রিসভার নিরঙ্কুশ বা স্বৈরাচারী শাসন।
ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের এমন একটি অবস্থা, যেখানে ক্যাবিনেট বা মন্ত্রিসভা ক্ষমতার ওপর চরম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে আইনসভার ভূমিকা গৌণ হয়ে যায় এবং সরকারপ্রধান বা তার মন্ত্রিসভাই কার্যত রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। এই অবস্থা তখন দেখা যায় যখন ক্ষমতাসীন দল সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, যার ফলে বিরোধী দল বা আইনসভার অন্য সদস্যদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যায়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও গবেষক এই ধারণাটিকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা দেওয়া হলো:
১। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski): লাস্কি মনে করেন, “মন্ত্রিসভার একনায়কত্ব হলো সংসদীয় সরকারের এমন একটি অবস্থা যেখানে মন্ত্রিসভা আইনসভার ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং নীতি নির্ধারণে একক ক্ষমতা ব্যবহার করে।”
২। কার্ল মার্কস (Karl Marx): মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, “মন্ত্রিসভার একনায়কত্ব হলো বুর্জোয়া রাষ্ট্রের একটি রূপ, যেখানে নির্বাচিত সরকার নামে পুঁজিবাদী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী একটি ক্ষুদ্র দল ক্ষমতা কুক্ষিগত করে।”
৩। স্যার উইলিয়াম আনসন (Sir William Anson): স্যার উইলিয়াম আনসন এই ধারণাটি প্রথম ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, “ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভা পার্লামেন্টের ওপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করে, বিশেষ করে আইন প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে।”
৪। লর্ড হিউ ডাল্টন (Lord Hugh Dalton): লর্ড ডাল্টন এর মতে, “প্রধানমন্ত্রী একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পার্লামেন্টে শাসন করেন এবং ক্যাবিনেট তার ইচ্ছা অনুযায়ী যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটিই হলো ক্যাবিনেট একনায়কত্ব।”
৫। স্যার ইভর জেনিংস (Sir Ivor Jennings): জেনিংস তার ‘Cabinet Government’ গ্রন্থে বলেছেন, “আধুনিক ব্রিটিশ সরকার ব্যবস্থায়, প্রধানমন্ত্রীকে একটি ‘নির্বাচিত স্বৈরশাসক’ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তার মন্ত্রিসভা প্রায়শই পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে নীতি নির্ধারণ করে।”
৬। গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ড (Gabriel Almond): অ্যালমন্ডের মতে, “ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব হলো এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে নির্বাহী শাখা আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে এমনভাবে কেন্দ্রীভূত করে যে, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণের মূল নীতিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
৭। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte): অগাস্ট কোঁৎ-এর মতে, “একটি সমাজ যখন ইতিবাচক পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন সরকার বা শাসনকারী সংস্থা সম্পূর্ণভাবে জনগণের কল্যাণের জন্য তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব সেই অবস্থায় পরিণত হয় যখন এই সংস্থাটি ক্ষমতার মাধ্যমে জনগণের উপর তার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়।
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি যে, ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব হলো সংসদীয় শাসনব্যবস্থার একটি ত্রুটিপূর্ণ অবস্থা, যেখানে মন্ত্রিসভা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইনসভার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, ফলে আইনসভা একটি রবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয় এবং জনগণের স্বার্থের চেয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা প্রকট হয়।
উপসংহার: ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব আধুনিক গণতন্ত্রের একটি গভীর সংকট। এটি ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করে এবং আইনসভার জবাবদিহিতা ও সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করে। এই অবস্থা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য একটি বড় হুমকি, কারণ এটি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত করে। তাই, একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য এই প্রবণতাকে প্রতিরোধ করা এবং ক্ষমতা বিভাজনের নীতিকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য।
ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের এমন একটি অবস্থা, যেখানে ক্ষমতাসীন মন্ত্রিসভা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইনসভার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে।
‘ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব’ ধারণাটি ১৯শ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রথম আলোচিত হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট (William Pitt)-এর সময় থেকেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিংশ শতকে, বিশেষ করে ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন (Government of India Act, 1919) এবং ১৯৩৫ সালের আইন (Government of India Act, 1935) এর মতো আইনি কাঠামোতে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ১৯৯০-এর দশকে একটি জরিপে দেখা যায়, ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার প্রায় ৭০% আইন পার্লামেন্টের সরাসরি বিতর্ক ছাড়াই অনুমোদিত হয়েছে।

