- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ১৫ দলীয় জোট ও ৭ দলীয় ঐক্যজোট স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ১৫ দল ও ৭ দলীয় ঐক্যজোটের ভূমিকা
১। রাজনৈতিক পটভূমি: স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে।
২। ৭ দলীয় জোট গঠন: ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শাসনের অবসান, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে আনা। এই জোট বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩। ১৫ দলীয় জোট গঠন: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট গঠিত হয়। বিভিন্ন বাম, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এই জোটে অংশ নেয়। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
৪। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন: ১৫ দল ও ৭ দলীয় ঐক্যজোট এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, সমাবেশ ও আন্দোলনের মাধ্যমে তারা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে।
৫। গণতান্ত্রিক দাবি উত্থাপন: উভয় জোট জনগণের ভোটাধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরে। তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা জনগণের মধ্যে আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
৬। যুগপৎ আন্দোলন: ১৫ দল ও ৭ দলীয় জোট পৃথক রাজনৈতিক অবস্থানে থেকেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অনেক ক্ষেত্রে যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই ঐক্য আন্দোলনকে শক্তিশালী করে এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
৭। জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি: এই জোটগুলো রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়। ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত হয়। ফলে আন্দোলন একটি ব্যাপক গণআন্দোলনে পরিণত হয়।
৮। নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি: ১৫ দল ও ৭ দলীয় জোট অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানায়। তারা মনে করত, জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তাই নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার তাদের আন্দোলনের অন্যতম বিষয় ছিল।
৯। রাজনৈতিক ঐক্য সৃষ্টি: সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে এই জোটগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাহরণ সৃষ্টি করে।
১০। গণআন্দোলনের চাপ বৃদ্ধি: ১৫ দল ও ৭ দলীয় জোটের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে এরশাদ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পায়। বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি, জনসমর্থন এবং আন্তর্জাতিক চাপ সরকারের অবস্থানকে দুর্বল করে তোলে।
১১। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে ১৫ দল, ৭ দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছাত্র আন্দোলন ও গণআন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক জোটগুলোর সমন্বয় এরশাদ সরকারের পতনের পথ তৈরি করে।
১২। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা: ১৯৯০ সালের আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর ফলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
১৩। বিরোধী রাজনীতির বিকাশ: এই জোটগুলোর আন্দোলন বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশে ভূমিকা রাখে। সরকারবিরোধী আন্দোলন, জনমত তৈরি এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
১৪। সীমাবদ্ধতা: ১৫ দল ও ৭ দলীয় জোটের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য ছিল। অনেক সময় কর্মসূচি ও রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। ফলে সব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।
১৫। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে প্রভাব: এই জোটগুলোর আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতন্ত্রের গুরুত্ব বৃদ্ধি করে। জনগণের অধিকার, ভোটের মূল্য এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল।
১৬। রাজনৈতিক শিক্ষার ভূমিকা: ১৫ দল ও ৭ দলীয় জোটের আন্দোলন জনগণকে রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে। তারা দেখিয়েছে যে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
১৭। ঐতিহাসিক গুরুত্ব: বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ১৫ দল ও ৭ দলীয় ঐক্যজোট একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাদের আন্দোলন স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামকে শক্তিশালী করে এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে।
উপসংহার: বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ১৫ দল ও ৭ দলীয় ঐক্যজোটের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। যদিও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল, তবুও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের ঐক্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।