- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রস্তাবনা: গণপরিষদ হলো একটি দেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত বিশেষায়িত একটি সংস্থা। যখন একটি জাতি নতুন করে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায়, তখন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই পরিষদই জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি মৌলিক আইন বা সংবিধান তৈরি করে। এটি কেবল একটি আইন প্রণয়নকারী সংস্থা নয়, বরং এটি একটি জাতির সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক। বিশেষ করে স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি নতুন রাষ্ট্রকে বৈধতা ও দিকনির্দেশনা দিতে গণপরিষদের ভূমিকা অপরিহার্য।
গণপরিষদ (Constituent Assembly) হলো এমন একটি বিশেষ পরিষদ, যা একটি দেশের সংবিধান প্রণয়ন বা সংশোধনের জন্য গঠিত হয়। সাধারণত, কোনো দেশ স্বাধীনতা লাভের পর বা বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হলে এই ধরনের পরিষদ গঠন করা হয়। এর সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে অথবা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যাদের প্রধান কাজ হলো জাতির আকাঙ্ক্ষা ও আদর্শের ভিত্তিতে একটি মৌলিক আইন (সংবিধান) তৈরি করা।
গণপরিষদের মূল কাজ হলো রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, সরকার পরিচালনার নীতি, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য এবং ক্ষমতা বিভাজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। এটি শুধুমাত্র আইন প্রণয়নকারী সংস্থা নয়, বরং এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণ করে। গণপরিষদ গঠিত হওয়ার পর এটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য কাজ করে এবং সংবিধান প্রণীত হলে এর কার্যকারিতা শেষ হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপাপটে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য একটি সংবিধান অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তাই ১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি আদেশ জারি করে বাংলাদেশের গণপরিষদ গঠন করেন। এই পরিষদের সদস্যরা ছিলেন ১৯৭০ সালের পাকিস্তান প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে নির্বাচিত পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রতিনিধিরা। বাংলাদেশের গণপরিষদ মাত্র ৯ মাসের মধ্যে একটি যুগোপযোগী সংবিধান প্রণয়ন করে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে।
সংক্ষেপে, গণপরিষদ হলো সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত একটি অস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সংস্থা, যা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মৌলিক ভূমিকা পালন করে। এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশের মৌলিক আইন তৈরি করেন।
উপসংহার: গণপরিষদ একটি জাতির জন্য কেবল সংবিধান প্রণেতা নয়, এটি তার আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতের প্রতীক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, গণপরিষদের গঠন এবং মাত্র ৯ মাসের মধ্যে একটি যুগোপযোগী সংবিধান প্রণয়ন ছিল এক ঐতিহাসিক অর্জন। এটি প্রমাণ করে যে, সদ্য স্বাধীন একটি জাতি কতটা দ্রুত নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণে সক্ষম। গণপরিষদের মাধ্যমে প্রণীত সংবিধানই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং আজও রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
গণপরিষদ হলো সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিশেষ পরিষদ।
বাংলাদেশের গণপরিষদ গঠিত হয় ১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদেশে। এই পরিষদের সদস্য সংখ্যা ছিল ৪০৩ জন, যারা মূলত ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে ১৯৭২ সালের ১০ই এপ্রিল। এটি মাত্র ৯ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করে। ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে তা কার্যকর হয়। এর ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত সংবিধান প্রণয়নকারী দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের এই গণপরিষদ দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে।

