- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: গ্রামীণ সমাজসেবা হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করে। এটি শুধু দারিদ্র্য দূরীকরণ বা ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং গ্রামীণ সমাজের উন্নয়নে একটি সামগ্রিক ও সুসংগঠিত প্রচেষ্টা। এর লক্ষ্য হলো গ্রামীণ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা, যেমন: নিরক্ষরতা, স্বাস্থ্যহীনতা, বেকারত্ব, এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে তাদের জীবনকে আরও সহজ ও উন্নত করা।
গ্রামীণ সমাজসেবা বলতে বোঝায় সেই সমস্ত সংগঠিত কার্যক্রম যা গ্রামীণ সমাজের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে পরিচালিত হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। এই সেবাগুলো সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক।
শাব্দিক অর্থ: ‘গ্রামীণ’ শব্দটি গ্রাম বা গ্রামের সাথে সম্পর্কিত এবং ‘সমাজসেবা’ বলতে সমাজের কল্যাণে পরিচালিত কাজ বোঝায়। সুতরাং, গ্রামীণ সমাজসেবা এর শাব্দিক অর্থ হলো ‘গ্রামের মানুষের কল্যাণের জন্য পরিচালিত সেবা’।
বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক সমাজের কল্যাণ ও উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে যে সংজ্ঞাগুলো দিয়েছেন, তা গ্রামীণ সমাজসেবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নিচে তাদের কিছু সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো:
১। সমাজবিজ্ঞানী ওডুম (Odum) ও মুর (Moore) – তাদের মতে, সমাজসেবা হলো একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যা সমাজের বিশেষ প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে (Social service is a scientific method that carries out certain activities for the specific needs of society)।
২। অধ্যাপক সি.এ. মর্গান (C.A. Morgan) – তিনি সমাজসেবাকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা সমাজের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে (He defines social service as a process that improves the quality of life of society members through mutual cooperation and development of human relationships)।
৩। ডব্লিউ.এ. ফ্রিডল্যান্ডার (W.A. Friedlander) – তিনি বলেন, সমাজসেবা হলো একটি পেশাদার সেবা, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমস্যা সমাধানে সহায়ক (He says, social service is a professional service that helps solve the problems of people from different levels of society)।
৪। অধ্যাপক ই.এস. বোগার্ডাস (E.S. Bogardus) – তার মতে, সমাজসেবা হলো সমাজের দুর্বল, পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়নের জন্য পরিচালিত সকল প্রকার কার্যক্রম (According to him, social service is all kinds of activities carried out for the development of weak, backward, and disadvantaged people of society)।
৫। স্যার উইলিয়াম বেভারিজ (Sir William Beveridge) – তিনি সমাজসেবাকে সমাজের পাঁচটি বৃহৎ শত্রু, যেমন: দারিদ্র্য, রোগ, নিরক্ষরতা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বেকারত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন (He defines social service as an effort to free people from the five great enemies of society: poverty, disease, illiteracy, unhealthy environment, and unemployment)।
৬। সমাজবিজ্ঞানী হ্যারিস (Harris) – তিনি বলেন, সমাজসেবা হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি সদস্য তার সর্বোচ্চ সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারে এবং সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে (He says, social service is the process by which every member of society can develop their full potential and contribute to the development of society)।
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা গ্রামীণ সমাজসেবাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি যে, এটি হলো একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া, যা গ্রামীণ সমাজের পিছিয়ে পড়া, দরিদ্র এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক, ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য, নিরক্ষরতা ও দারিদ্র্য দূর করে একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠন করা।
উপসংহার: গ্রামীণ সমাজসেবা একটি গতিশীল এবং অপরিহার্য কার্যক্রম, যা গ্রামীণ জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এটি কেবল সমস্যার সমাধান নয়, বরং একটি টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। গ্রামীণ মানুষের ক্ষমতায়ন এবং তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজসেবা একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সেবার মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, সামাজিকভাবে উন্নত এবং শিক্ষাগতভাবে সচেতন হয়ে ওঠে।
গ্রামীণ সমাজসেবা হলো একটি পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করে।
১৯৬১ সালে বাংলাদেশে গ্রামীণ সমাজসেবা কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭৪ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই কার্যক্রমটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ২০১৭ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৭৫% মানুষ গ্রামীণ অঞ্চলে বাস করে, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশ দারিদ্র্য ও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার শিকার। এই কারণে গ্রামীণ সমাজসেবার গুরুত্ব অপরিসীম।

