- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের গঠন একটি মাইলফলক। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই পরিষদ বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে বেগবান করে এবং আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের পতনকে ত্বরান্বিত করে। তৎকালীন প্রধান ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই সংগ্রাম পরিষদ শুধু ছাত্রসমাজের নয়, বরং আপামর জনসাধারণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল এবং স্বাধীনতার পথে জাতিকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছিল। তাদের ঐতিহাসিক ১১-দফা কর্মসূচি বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
১৯৬৯ সালের ৫ই জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানো এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে জোরালোভাবে তুলে ধরা। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে সংগঠিত ও তার নেতৃত্ব প্রদানে এই পরিষদ মূখ্য ভূমিকা পালন করে।
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উত্থাপিত ছয়দফা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে এবং পরবর্তীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাকেসহ অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হলে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এর ফলশ্রুতিতে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়ে এই পরিষদ গঠন করেন।
এই পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতারা, যারা খুব দ্রুতই সমগ্র ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন। ১৪ জানুয়ারি এই পরিষদ তাদের ঐতিহাসিক ১১-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই ১১-দফা কেবল ছাত্রদের দাবি-দাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এতে কৃষক, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের জনগণের অধিকারের কথা বলা হয়েছিল, যা একে একটি গণদাবিতে পরিণত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলেও তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়।
উপসংহার: সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শুধু একটি ছাত্র সংগঠন ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতার মুহূর্তে ছাত্রনেতারাই জাতিকে পথ দেখিয়েছিলেন এবং তাদের দূরদর্শী কর্মসূচি ও আপোসহীন সংগ্রামের ফলেই আইয়ুব শাহীর পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল। এই পরিষদের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

