- readaim.com
- 0
উত্তর।। মুখবন্ধ: সপ্তদশ শতাব্দীর প্রভাবশালী দার্শনিক জন লক, তার রাজনৈতিক দর্শন দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত গড়ে তুলেছেন। তার চিন্তাধারার মূল ভিত্তি ছিল মানব প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক রাজ্যের ধারণা। লক বিশ্বাস করতেন যে, মানুষ জন্মগতভাবেই কিছু নির্দিষ্ট অধিকার নিয়ে আসে এবং রাষ্ট্রকে সেই অধিকারগুলো রক্ষা করতে হয়। তার এই ধারণা পরবর্তীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও দার্শনিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে, যা আজও আমাদের সমাজে প্রাসঙ্গিক।
১. যুক্তি ও বিবেক: জন লক মনে করতেন যে, মানুষ জন্মগতভাবে যুক্তিবাদী এবং বিবেকসম্পন্ন। এই যুক্তিই মানুষকে সঠিক-বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বাস করলেও তাদের মধ্যে একটি নৈতিক আইন কাজ করে, যা তারা নিজেদের বিবেক দিয়ে বুঝতে পারে। এই নৈতিক আইন তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। লক মনে করতেন যে, এই যুক্তিবাদী মানব প্রকৃতিই একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। তিনি জোর দিয়েছিলেন যে, এই যুক্তি ব্যবহার করে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে পারে।
২. সমান ও স্বাধীন: লকের মতে, প্রকৃতির রাজ্যে সকল মানুষ জন্মগতভাবে সমান ও স্বাধীন। কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির উপর প্রভুত্ব করার অধিকার রাখে না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জীবনের এবং সম্পত্তির মালিক। এই ধারণার অর্থ হলো, কারোরই অন্যের জীবন, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা বা সম্পদ কেড়ে নেওয়ার অধিকার নেই। লক এই সমতার উপর ভিত্তি করে প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, এই স্বাধীনতা ও সমতা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং কোনো সরকার বা শাসকের এই অধিকার লঙ্ঘন করার ক্ষমতা নেই।
৩. প্রাকৃতিক অধিকার: জন লকের দর্শনে প্রাকৃতিক অধিকার একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। তিনি মনে করতেন যে, প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার নিয়ে জন্মায়। এই অধিকারগুলো কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের দেওয়া নয়, বরং প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে এগুলি মানুষের সহজাত অধিকার। এই অধিকারগুলো অলঙ্ঘনীয় এবং কোনো সরকার বা ব্যক্তি এই অধিকারগুলো কেড়ে নিতে পারে না। লকের মতে, এই অধিকারগুলো সুরক্ষিত করার জন্যই মানুষেরা একটি সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করে। যদি কোনো সরকার এই অধিকারগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই সরকারকে উৎখাত করার অধিকার আছে।
৪. সম্পত্তির ধারণা: লক বলেন যে, সম্পত্তির অধিকার একটি প্রাকৃতিক অধিকার। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি যখন তার শ্রমের মাধ্যমে কোনো কিছুকে প্রকৃতির সাধারণ অবস্থা থেকে বের করে আনে, তখন সেটি তার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন একজন কৃষক জমি চাষ করে ফসল ফলায়, তখন সেই ফসল তার নিজস্ব সম্পত্তি। তিনি মনে করতেন যে, শ্রমের মাধ্যমেই সম্পত্তির মূল্য সৃষ্টি হয়। তবে এই অধিকারের একটি সীমাও আছে। একজন ব্যক্তি কেবল ততটুকুই সম্পত্তি অর্জন করতে পারে, যা সে ব্যবহার করতে পারে এবং যা নষ্ট হয় না। তিনি জোর দিয়েছিলেন যে, সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
৫. প্রাকৃতিক আইনের শাসন: প্রকৃতির রাজ্যে কোনো সরকার বা রাষ্ট্র না থাকলেও, সেখানে একটি প্রাকৃতিক আইন কার্যকর থাকে। এই আইন বলে যে, কোনো ব্যক্তি অন্যের জীবন, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা বা সম্পত্তি নষ্ট করতে পারে না। এই আইন মানুষের বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয় এবং এটি স্রষ্টার কাছ থেকে এসেছে বলে লক মনে করেন। এই প্রাকৃতিক আইন সকল মানুষকে নিজেদের অধিকার এবং অন্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। যখন কোনো ব্যক্তি এই আইন লঙ্ঘন করে, তখন যে কোনো ব্যক্তিই সেই অপরাধের বিচার করার বা শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাখে। তবে, এই বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই মানুষ একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র গঠন করতে ইচ্ছুক হয়।
৬. সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য: লক বিশ্বাস করতেন যে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন শান্তিপূর্ণ এবং সুখে ভরা। হবস যেমন প্রকৃতির রাজ্যকে যুদ্ধ ও ভয়ের রাজ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন, লক তার সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করেন। তার মতে, বেশিরভাগ মানুষই যুক্তিবাদী এবং তারা প্রাকৃতিক আইন মেনে চলে। তাই প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করে। মানুষের এই শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য যখন কোনো কারণে বিঘ্নিত হয়, তখনই তারা একটি সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করার কথা ভাবে। তিনি মনে করতেন যে, মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো নিজেদের এবং সমাজের মঙ্গল সাধন করা।
৭. প্রাকৃতিক রাজ্যের অসম্পূর্ণতা: যদিও লক প্রকৃতির রাজ্যকে শান্তিপূর্ণ বলে মনে করতেন, তবুও তিনি এর কিছু অসম্পূর্ণতা তুলে ধরেছিলেন। প্রকৃতির রাজ্যে কোনো নির্দিষ্ট বিচারক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নেই। এর ফলে, যখন কোনো বিরোধ দেখা দেয়, তখন তার সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিটি ব্যক্তি নিজেই বিচারক এবং আইন প্রয়োগকারী হয়ে ওঠে। এতে পক্ষপাতিত্ব এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। এই অসম্পূর্ণতাগুলো দূর করার জন্যই মানুষ একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র বা সরকার গঠনের প্রয়োজন অনুভব করে। রাষ্ট্রের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
৮. সামাজিক চুক্তি: জন লকের মতে, প্রকৃতির রাজ্যের অসম্পূর্ণতা দূর করার জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় একটি সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে তারা নিজেদের কিছু ক্ষমতা একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে তুলে দেয়। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির মতো প্রাকৃতিক অধিকারগুলো রক্ষা করা। লক বলেন যে, এই চুক্তি কোনো একতরফা বাধ্যবাধকতা নয়, বরং সরকার এবং জনগণের মধ্যে একটি পারস্পরিক সমঝোতা। জনগণ সরকারকে ক্ষমতা দেয়, আর সরকার তাদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। যদি সরকার এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তবে জনগণ সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে।
৯. সীমিত সরকার: লক সীমিত বা সীমাবদ্ধ সরকারের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন। তার মতে, সরকারের ক্ষমতা অসীম নয়। সরকার শুধুমাত্র সেইসব ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে যা জনগণ স্বেচ্ছায় তাকে দিয়েছে। সরকারের প্রধান কাজ হলো জনগণের প্রাকৃতিক অধিকারগুলো রক্ষা করা। সরকার কোনোভাবেই এই অধিকারগুলো লঙ্ঘন করতে পারে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সরকারের ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকা উচিত, যাতে সরকার স্বৈরাচারী হতে না পারে। এই সীমিত সরকারের ধারণা আধুনিক গণতন্ত্রের একটি মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
১০. জনগণের সম্মতি: জন লকের রাজনৈতিক দর্শনে জনগণের সম্মতি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তিনি বলেন যে, কোনো সরকারের বৈধতা নির্ভর করে জনগণের সম্মতির উপর। যদি কোনো সরকার জনগণের সম্মতি ছাড়া শাসন করে, তবে সেই সরকার অবৈধ। জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এবং জনগণের ইচ্ছানুসারেই কাজ করতে বাধ্য থাকে। যদি সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করে, তবে জনগণ সেই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করার বা পরিবর্তন করার অধিকার রাখে। এই ধারণা আধুনিক গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
১১. ক্ষমতার বিভাজন: লক রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বিভাজিত করার পক্ষে ছিলেন। তিনি আইন প্রণয়ন (আইনসভা), আইন কার্যকর করা (শাসন বিভাগ) এবং বিদেশি সম্পর্ক পরিচালনা (ফেডারেটিভ ক্ষমতা) এই তিনটি ভাগে ক্ষমতার বিভাজনের কথা বলেছিলেন। যদিও তিনি পুরোপুরি আধুনিক ক্ষমতার বিভাজন (আইন, বিচার ও শাসন) এর কথা বলেননি, তার এই ধারণা মঁপতঁসিয়ে (Montesquieu) এর মতো পরবর্তী দার্শনিকদের অনুপ্রাণিত করেছিল। লক বিশ্বাস করতেন যে, ক্ষমতা এক হাতে কেন্দ্রীভূত হলে স্বৈরাচারের ঝুঁকি থাকে। তাই ক্ষমতার বিভাজন একটি স্বাধীন ও ন্যায়সঙ্গত সরকার গঠনের জন্য অপরিহার্য।
১২. আইনের শাসন: জন লকের মতে, প্রকৃতির রাজ্যে যেমন প্রাকৃতিক আইন কাজ করে, তেমনি রাষ্ট্রের অধীনেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা উচিত। সরকারের ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছানুসারে পরিচালিত হবে না, বরং সুনির্দিষ্ট আইনের দ্বারা পরিচালিত হবে। এই আইন সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। তিনি বলেন যে, আইনের শাসন জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয় এবং স্বৈরাচারী শাসন থেকে রক্ষা করে। আইনের চোখে সবাই সমান, এই নীতিটি লকের এই ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৩. প্রতিরোধের অধিকার: লক বিশ্বাস করতেন যে, যদি কোনো সরকার তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং জনগণের প্রাকৃতিক অধিকারগুলো লঙ্ঘন করে, তবে জনগণের সেই সরকারকে প্রতিরোধ করার অধিকার আছে। এটিকে তিনি “আপিল টু হেভেন” (Appeal to Heaven) নামে অভিহিত করেছিলেন। এই অধিকারের অর্থ হলো, জনগণ যদি দেখে যে সরকার তাদের জীবনের, স্বাধীনতার বা সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ, তবে তারা সেই সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে। এই ধারণাটি আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবের মতো অনেক ঐতিহাসিক আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
১৪. ধর্মীয় সহনশীলতা: জন লক ধর্মীয় সহনশীলতার পক্ষে একজন শক্তিশালী প্রবক্তা ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে, সরকার কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে পারে না। রাষ্ট্রের কাজ হলো জনগণের পার্থিব জীবন ও অধিকার রক্ষা করা, ধর্মীয় বিশ্বাস নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ বিশ্বাস পালনের স্বাধীনতা থাকা উচিত। লকের এই ধারণা ধর্মীয় স্বাধীনতার আধুনিক ধারণার ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং বহুত্ববাদী সমাজের জন্ম দিয়েছে।
১৫. জ্ঞানের উৎস হিসেবে অভিজ্ঞতা: জন লকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারণা ছিল যে, মানুষের মন জন্মকালে একটি সাদা কাগজের মতো (Tabula Rasa)। তিনি বলেন, জ্ঞান সহজাত নয়, বরং আমাদের সব জ্ঞান অভিজ্ঞতা থেকে আসে। আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা বাইরের জগত থেকে তথ্য পাই এবং মন সেগুলোকে প্রক্রিয়া করে জ্ঞান তৈরি করে। এই ধারণাটি মানব প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছে, কারণ তিনি মনে করতেন যে মানুষ তার অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে পারে এবং একটি ভালো সমাজ গড়তে পারে।
১৬. ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ: জন লকের দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ। তিনি মনে করতেন যে, সমাজ বা রাষ্ট্রের চেয়ে ব্যক্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতাকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। রাষ্ট্র গঠিত হয় ব্যক্তির অধিকার রক্ষার জন্য, তাই রাষ্ট্র ব্যক্তির উপর নয়, বরং ব্যক্তির সেবা করার জন্য তৈরি। এই ধারণাটি আধুনিক উদারনীতিবাদের একটি মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ, বিশ্বাস এবং জীবনযাপনের অধিকারকে সম্মান জানায়।
১৭. সমাজ গঠনের উদ্দেশ্য: লকের মতে, সমাজ গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতির রাজ্যের অসম্পূর্ণতা দূর করা এবং জনগণের প্রাকৃতিক অধিকারগুলো সুরক্ষা দেওয়া। প্রকৃতির রাজ্যে বিচার ব্যবস্থার অভাব, আইন প্রয়োগের অনিশ্চয়তা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জটিলতা ছিল। এই সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় একটি চুক্তির মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ এবং সরকার গঠন করে। সুতরাং, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কোনো দৈব বিধান নয়, বরং এটি মানুষের যুক্তিবাদী প্রয়োজনের ফল।
১৮. রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা: লকের মতে, রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা স্বেচ্ছাকৃত এবং শর্তসাপেক্ষ। জনগণ সরকারকে মেনে চলে কারণ সরকার তাদের অধিকারগুলো রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। যদি সরকার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই সরকারকে মানতে কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই ধারণাটি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের বৈধতা এবং সীমানা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে এবং আধুনিক গণতন্ত্রে জনগণের অধিকারকে প্রাধান্য দেয়।
১৯. সরকারের ভাঙন: লক বিশ্বাস করতেন যে, যখন সরকার জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং তাদের অধিকার লঙ্ঘন করতে শুরু করে, তখন সেই সরকারের ভাঙন অনিবার্য। যদি সরকার তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে, যেমন- জনগণের সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করা বা নির্বাচিত আইনসভার পরিবর্তে স্বেচ্ছাচারী আইন জারি করা, তবে জনগণ সেই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠন করতে পারে। এই ধারণাটি জনগণের সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত প্রকাশ।
২০. নৈতিক সমতা: লকের মতে, নৈতিক সমতা হলো মানুষের মধ্যে একটি মৌলিক এবং সহজাত ধারণা। প্রকৃতির রাজ্যে সকল মানুষ সমান, কারণ তারা সবাই একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি এবং সবাই যুক্তিবাদী। এই নৈতিক সমতাই অন্যদের অধিকারকে সম্মান করার এবং প্রাকৃতিক আইন মেনে চলার মূল ভিত্তি। এই ধারণার উপর ভিত্তি করে লক দেখান যে, কেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্য কারো উপর শাসন করার জন্মগত অধিকার রাখে না।
২১. স্বাধীনতার প্রকৃতি: লক স্বাধীনতাকে স্বেচ্ছাচারিতা থেকে আলাদা করেন। তার মতে, স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছে তাই করা নয়, বরং প্রাকৃতিক আইনের অধীনে থাকা। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি ততক্ষণ স্বাধীন যতক্ষণ সে প্রাকৃতিক আইন এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের অধীনেও স্বাধীনতা সম্ভব, যদি সেই রাষ্ট্র জনগণের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে এবং যুক্তিসঙ্গত আইন দ্বারা পরিচালিত হয়।
উপসংহার: জন লকের মানব প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক রাজ্যের ধারণা আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার দর্শন শুধু সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তাধারাকেই প্রভাবিত করেনি, বরং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তিও স্থাপন করেছে। জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা, সীমিত সরকার এবং প্রতিরোধের অধিকারের মতো তার মূল নীতিগুলো আজও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লকের চিন্তাধারা আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবসহ বিভিন্ন স্বাধীনতা আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে, যা প্রমাণ করে যে তার দর্শন আজও কতটা প্রাসঙ্গিক ও শক্তিশালী।
১. 🧠 যুক্তি ও বিবেক
২. 🤝 সমান ও স্বাধীন
৩. 📜 প্রাকৃতিক অধিকার
৪. 💰 সম্পত্তির ধারণা
৫. ⚖️ প্রাকৃতিক আইনের শাসন
৬. 🧘 সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য
৭. 🚧 প্রাকৃতিক রাজ্যের অসম্পূর্ণতা
৮. 🤝 সামাজিক চুক্তি
৯. 🎯 সীমিত সরকার
১০. 🗳️ জনগণের সম্মতি
১১. 🏛️ ক্ষমতার বিভাজন
১২. 📜 আইনের শাসন
১৩. ⚔️ প্রতিরোধের অধিকার
১৪. 🙏 ধর্মীয় সহনশীলতা
১৫. 🧠 জ্ঞানের উৎস হিসেবে অভিজ্ঞতা
১৬. 🧍 ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ
১৭. 🏘️ সমাজ গঠনের উদ্দেশ্য
১৮. 🤝 রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা
১৯. 💥 সরকারের ভাঙন
২০. ⚖️ নৈতিক সমতা
২১. 🕊️ স্বাধীনতার প্রকৃতি
জন লকের জীবন ও দর্শন ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব (Glorious Revolution) দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এই বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সীমিত হয় এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত হয়। ১৬৯০ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ “Two Treatises of Government” এই বিপ্লবকে সমর্থন করে রচিত হয়েছিল। এই গ্রন্থে তিনি রাজা প্রথম জেমস-এর দৈব অধিকারের ধারণাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেন এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা তুলে ধরেন। লকের ধারণা আমেরিকান উপনিবেশগুলিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল এবং ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Declaration of Independence)-এর প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল। বিশেষ করে “জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের অন্বেষণ” (Life, Liberty, and the pursuit of Happiness) এই বাক্যাংশটি লকের প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণারই প্রতিধ্বনি। ১৮শ শতাব্দীর ফরাসি বিপ্লব এবং পরবর্তীতে আরও অনেক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল ভিত্তি হিসেবেও তার দর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

