- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠে জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকা সত্ত্বেও কেবল সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রযুক্তির অনন্য সমন্বয়ে দেশটি অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্বজুড়ে জাপানের এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উত্থানই ‘জাপানের উন্নয়ন মডেল’ হিসেবে পরিচিত।
জাপানের উন্নয়ন মডেল
১। মানবসম্পদ উন্নয়ন: জাপান কোনো খনিজ সম্পদের ওপর নির্ভর না করে তার বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করেছে। শিক্ষার হার শতভাগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারিগরি ও নৈতিক শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি নাগরিককে কঠোর পরিশ্রমী, সময়ানুবর্তী এবং দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল এই মডেলের মূল ভিত্তি। দক্ষ মানবসম্পদই দেশটির অর্থনৈতিক চাকা সচল রেখেছে।
২। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার: জাপান নিজেদের মৌলিক গবেষণার পাশাপাশি পশ্চিমা প্রযুক্তি আমদানি করে সেটিকে আরও উন্নত ও সাশ্রয়ী করার নীতি গ্রহণ করে। ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি নির্মাণ এবং ভারী শিল্পে রোবোটিক্স ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে তারা বিশ্ববাজার দখল করে। প্রযুক্তির এই অনবদ্য ব্যবহার জাপানি পণ্যকে বিশ্বজুড়ে নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় করে তোলে, যা তাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
৩। কাইজেন দর্শন: জাপানি ব্যবস্থাপনাবিদ্যার একটি অন্যতম মূল ভিত্তি হলো ‘কাইজেন’, যার অর্থ ক্রমাগত বা ধারাবাহিক উন্নতি। উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে অপচয় কমানো এবং প্রতিদিন ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে গুণগত মান বৃদ্ধি করাই এর লক্ষ্য। এই দর্শনের কারণে জাপানি পণ্যগুলো বিশ্ববাজারে স্থায়িত্ব ও নিখুঁততার প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে।
৪। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব: জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকার এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে এক চমৎকার ও নিবিড় সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় (MITI) বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক নীতি সহায়তা, ঋণ সুবিধা এবং দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। এই যৌথ প্রচেষ্টার ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জাপানি কোম্পানিগুলো সহজেই প্রতিযোগিতা করতে পেরেছে।
৫। রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন: জাপানের উন্নয়ন মডেলের অন্যতম প্রধান কৌশল ছিল আমদানির বিকল্প পণ্য দেশে তৈরি করা এবং রপ্তানি বৃদ্ধি করা। যুদ্ধের পর তারা ভারী শিল্প, যেমন জাহাজ নির্মাণ, ইস্পাত ও রাসায়নিক শিল্পের ওপর জোর দেয়। পরবর্তীতে তারা হালকা ইলেকট্রনিক্স ও গাড়ি রপ্তানিতে মনোযোগ দেয়। বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে তারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত সমৃদ্ধ করে।
৬। অবকাঠামোগত উন্নয়ন: একটি দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য, যা জাপান খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিল। তারা দেশজুড়ে বুলেট ট্রেন (শিনকানসেন), আধুনিক মহাসড়ক, উন্নত সমুদ্রবন্দর এবং বিমানবন্দর নির্মাণ করে। এই শক্তিশালী যোগাযোগ অবকাঠামো দেশের পণ্য পরিবহন খরচ বহুগুণ কমিয়ে দেয় এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে অভাবনীয় গতি প্রদান করে, যা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে।
৭। ভূমি সংস্কার: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই জাপান একটি বৈপ্লবিক ভূমি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে, যা তাদের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করে। বড় বড় জমিদারদের জমি সাধারণ কৃষকদের মধ্যে নামমাত্র মূল্যে বন্টন করে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে কৃষি উৎপাদন যেমন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। এই নতুন শ্রেণীটি পরবর্তীতে দেশীয় পণ্যের বড় ভোক্তা হয়ে ওঠে।
৮। দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান: জাপানি করপোরেট সংস্কৃতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘আজীবন কর্মসংস্থান’ বা লাইফটাইম এমপ্লয়মেন্ট প্রথা। কোনো সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর কর্মীরা সাধারণত অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই কাজ করার নিশ্চয়তা পেতেন। এর ফলে কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি গভীর আনুগত্য এবং কাজের প্রতি একাগ্রতা তৈরি হতো। এই মানসিক শান্তি ও কাজের নিরাপত্তা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে দারুণ ভূমিকা রেখেছিল।
৯। সঞ্চয় ও বিনিয়োগ: জাপানি নাগরিকদের সঞ্চয়ের প্রবণতা ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত বেশি, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মূলধন হিসেবে কাজ করেছে। ব্যাংকগুলোতে জমা হওয়া এই বিপুল সঞ্চয়কে সরকার অত্যন্ত কম সুদে দেশীয় শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে। ফলে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর না করেই জাপান নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বিশাল সব শিল্প প্রকল্প ও ব্যবসার অর্থায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল।
১০। জাতীয়তাবাদী চেতনা: জাপানের উন্নয়নের পেছনে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক শক্তি ছিল তাদের তীব্র দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা। যুদ্ধের পরাজয় গ্লানি মুছে ফেলে দেশকে আবার বিশ্বের বুকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার এক সম্মিলিত সংকল্প ছিল সবার মাঝে। ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখার এই মানসিকতাই জাপানিদের যেকোনো সংকটে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
কেন বিশ্বব্যাংক সমালোচনার সম্মুখীন হয়?
১। ঋণের কঠোর শর্ত: বিশ্বব্যাংক যখন অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ দেয়, তখন তার সাথে অত্যন্ত কঠোর কিছু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শর্ত জুড়ে দেয়। এই শর্তগুলোর মধ্যে থাকে ভর্তুকি কমানো, কর বৃদ্ধি এবং জনকল্যাণমূলক খাতের বাজেট সংকোচন। অনেক সময় এই শর্তগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
২। ভোটদানের বৈষম্য: বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং নীতি নির্ধারণে ধনী দেশগুলোর আধিপত্য নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে। সংস্থাটির ভোটাধিকার ব্যবস্থা মূলত সদস্য দেশগুলোর আর্থিক অবদানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। এর ফলে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলো পুরো সংস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। অথচ যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নীতি তৈরি হচ্ছে, তাদের মতামত এখানে উপেক্ষিত থেকে যায়।
৩। বেসরকারীকরণ নীতি: বিশ্বব্যাংক প্রায়শই ঋণগ্রহীতা দেশগুলোকে বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবা খাতগুলো বেসরকারীকরণ করার জন্য চাপ দেয়। এর ফলে এই জরুরি সেবাগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায় এবং করপোরেট মুনাফাখোরি বৃদ্ধি পায়। জনকল্যাণমূলক খাতকে পুঁজিবাদের হাতে তুলে দেওয়ার এই নীতিকে সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদরা তীব্রভাবে সমালোচনা করে থাকেন।
৪। পরিবেশগত বিপর্যয়: বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত অনেক বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, যেমন বড় বাঁধ নির্মাণ বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মারাত্মক পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর ফলে বিশাল বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে এমন পরিবেশ-বিধ্বংসী প্রকল্পে অর্থায়ন করার কারণে সংস্থাটি প্রতিনিয়ত সমালোচিত হচ্ছে।
৫। স্থানীয় সংস্কৃতি উপেক্ষা: বিশ্বব্যাংক প্রায়শই বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে তোয়াক্কা না করে সব দেশের জন্য একই অর্থনৈতিক মডেল চাপিয়ে দেয়। ওয়াশিংটন কনসেনসাসের এই ‘এক মাপে সবার জুতো’ নীতি অনেক দেশেই চরম ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন, ঐতিহ্য এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে নীতি নির্ধারণ করায় এর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
৬। উদ্বাস্তু সমস্যা সৃষ্টি: সংস্থাটির অর্থায়নে গৃহীত বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কারণে লাখ লাখ স্থানীয় ও আদিবাসী মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। সঠিক পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় এই মানুষগুলো চরম দারিদ্র্য ও উদ্বাস্তু জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ধ্বংসের এই দায় বিশ্বব্যাংক এড়াতে পারে না বলে সমালোচকরা মনে করেন।
৭। নব্য-উপনিবেশবাদ বিস্তার: সমালোচকদের মতে, বিশ্বব্যাংক মূলত পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি হাতিয়ার বা মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ঋণের ফাঁদে ফেলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে এক ধরনের আধুনিক নব্য-উপনিবেশবাদ কায়েম করা হচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র দেশগুলো তাদের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে।
৮। দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যর্থতা: বিশ্বব্যাংকের মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন হলেও দীর্ঘ কয়েক দশকেও তারা অনেক দেশে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেনি। সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশ বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন মেনে উল্টো আরও ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে তাদের নীতিগুলো ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
৯। স্বচ্ছতার অভাব: বিশ্বব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, নীতি নির্ধারণ এবং তহবিল বণ্টনের বিষয়টি অনেক সময়ই গোপন ও অস্পষ্ট থাকে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি ঋণগ্রহীতা দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান না। এই জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব সংস্থাটির গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বস্ততাকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিনিয়ত ক্ষুণ্ণ করছে।
১০। আমেরিকার একক আধিপত্য: বিশ্বব্যাংকের সদর দফতর ওয়াশিংটনে অবস্থিত এবং এর প্রেসিডেন্ট সবসময় একজন মার্কিন নাগরিকই হয়ে থাকেন, যা একটি অলিখিত নিয়ম। এই ব্যবস্থার কারণে সংস্থাটির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। আমেরিকার বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলো সহজেই সুবিধা পায়, আর তাদের বিরোধী দেশগুলো অর্থনৈতিক অবরোধ ও বৈষম্যের শিকার হয়, যা অত্যন্ত পক্ষপাতমূলক।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, জাপানের উন্নয়ন মডেল যেখানে কঠোর পরিশ্রম, মানবসম্পদ এবং নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে একটি স্বনির্ভর জাতির জন্ম দিয়েছে, সেখানে বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতি অনেক সময়ই বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি দেশের টেকসই অগ্রগতির জন্য কেবল বিদেশি ঋণের ওপর ভরসা না করে জাপানের মতো নিজস্ব শক্তির বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। তবেই বিশ্ব অর্থনীতিতে সমতা ও প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।