- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: তুলনামূলক রাজনীতি সামাজিক বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা যা বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান এবং আচরণের মধ্যেকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নিয়ে আলোচনা করে। এটি কেবল বিভিন্ন দেশের সংবিধান বা সরকারের কাঠামোর তুলনাই করে না, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলীয় ব্যবস্থা, নির্বাচন এবং রাজনৈতিক উন্নয়নের মতো গভীর বিষয়গুলোকেও বিশ্লেষণ করে। এর মূল লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র খুঁজে বের করা এবং রাজনৈতিক তত্ত্বকে আরও সমৃদ্ধ করা।
শাব্দিক অর্থ: ‘তুলনামূলক রাজনীতি’ বা ‘Comparative Politics’ কথাটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে ‘Politics’ বা ‘রাজনীতি’ বলতে রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বোঝায়। অন্যদিকে, ‘Comparative’ বা ‘তুলনামূলক’ শব্দটি দ্বারা দুই বা ততোধিক বিষয় বা বস্তুর মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নির্ণয়ের প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়। সুতরাং, শাব্দিক অর্থে তুলনামূলক রাজনীতি হলো বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা।
তুলনামূলক রাজনীতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই শাখা যা বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, প্রতিষ্ঠান, কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে মিল ও অমিলগুলো পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করে। এটি শুধুমাত্র ভিন্ন ভিন্ন দেশের রাজনৈতিক তুলনা করে না, বরং একই দেশের বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক অবস্থারও তুলনামূলক পর্যালোচনা করে। এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনার কারণ এবং তার ফলাফল সম্পর্কে একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করা হয়। এটি একটি অভিজ্ঞতাবাদী ও বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার ক্ষেত্র।
তুলনামূলক রাজনীতিকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংজ্ঞা প্রদান করা হলো:
১। জি. কে. রবার্টস (G.K. Roberts): “তুলনামূলক রাজনীতি হলো সেই ক্ষেত্র যা বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও আচরণের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের তুলনামূলক আলোচনার সাথে সম্পর্কিত।” (Comparative politics is the field concerned with the comparative study of political institutions and behaviors in different countries.)
২। জন ব্লন্ডেল (Jean Blondel): “তুলনামূলক রাজনীতি হলো সমসাময়িক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাবাদী ও বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ।” (Comparative politics is the empirical and scientific analysis of governments and political systems in the contemporary world.)
৩। মাইকেল কার্টিস (Michael Curtis): “তুলনামূলক রাজনীতি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সেগুলোর প্রতিষ্ঠান এবং কার্যাবলির মধ্যেকার সম্পর্ক আলোচনার একটি পদ্ধতি।” (Comparative politics is a method of studying political systems, their institutions, and their functions.)
৪। আর. সি. ম্যাক্রিডিস (R.C. Macridis): “তুলনামূলক রাজনীতি বিভিন্ন প্রকার রাজনৈতিক ব্যবস্থার গঠন ও কার্যাবলির তুলনামূলক বিশ্লেষণ।” (Comparative politics is the comparative analysis of the structures and functions of different kinds of political systems.)
৫। এস. ই. ফাইনার (S.E. Finer): “তুলনামূলক সরকার ও রাজনীতি হলো বিভিন্ন দেশের সরকারের ধরন, তাদের প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার তুলনামূলক আলোচনা।” (Comparative government and politics is the comparative study of the forms of government, their institutions, and political processes in different countries.)
৬। অ্যারেন্ড লিজফার্ট (Arend Lijphart): “তুলনামূলক রাজনীতি রাজনৈতিক বিজ্ঞানের সেই শাখা যা তুলনামূলক পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।” (Comparative politics is the subfield of political science that is built on the comparative method.)
৭। অ্যারিস্টটল: “তুলনামূলক রাজনীতি হলো বিভিন্ন সংবিধান ও সরকারের গঠনপ্রণালী বিশ্লেষণ করে সর্বোত্তম শাসনব্যবস্থা নির্ধারণ করা।” (Comparative politics is the study of constitutions to find the best form of government.)
৮। আলমন্ড: “তুলনামূলক রাজনীতি হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়নের মধ্যকার সম্পর্ক অনুসন্ধান।” (It explores the relationship between political culture and development.)
৯। ডেভিড ইস্টন: “তুলনামূলক রাজনীতি হলো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ইনপুট-আউটপুট মডেলের মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজের তুলনা।” (It compares societies through input-output models of political processes.)
১০। এডওয়ার্ড এ. ফ্রিম্যান: তুলনামূলক রাজনীতি হলো বিভিন্ন সরকারের রূপ এবং বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির তুলনামূলক বিশ্লেষণ। (Comparative politics is comparative analysis of the various forms of government and diverse political institutions.)
১১। ডেল হিচনার এবং ক্যারল লেভিং: তারা তাদের “Comparative Government and Politics” ১৯৬৭ গ্রন্থে বলেন, “তুলনামূলক রাজনীতি আধুনিক সরকার ব্যবস্থাসমূহের রাজনৈতিক অভিঙ্গতা, আটরণ, প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়া অধ্যায়ন করে।”
১২। এম. জি, স্মিথ: তিনি তার Comparative Politics প্রবন্ধে বলেছেন যে, তুলনামূলক রাজনীতি হচ্ছে সেই অধ্যায়নের ক্ষেত্র, যা রাজনৈতিক সংগঠনের প্রকারভেদ, তাদের বৈশিষ্ট্য, পারস্পরিক সম্পর্ক, ভিন্নতা ও পরিবর্তনের ধারা নিয়ে আলোচনা করে।
উপরের সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করে আমরা বলতে পারি যে, তুলনামূলক রাজনীতি হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই শাখা যা দুই বা ততোধিক দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান, প্রক্রিয়া এবং আচরণের মধ্যে বিদ্যমান সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যগুলোকে বিজ্ঞানসম্মত ও পদ্ধতিগত উপায়ে বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে সাধারণ তত্ত্ব বা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, তুলনামূলক রাজনীতির পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক এবং এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানই বৃদ্ধি করে না, বরং নিজ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও ভালোভাবে বুঝতে এবং এর সংস্কারের পথ খুঁজে বের করতেও সহায়তা করে। রাজনৈতিক তত্ত্ব নির্মাণ এবং রাজনৈতিক ঘটনা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষেত্রে এর অবদান অনস্বীকার্য। তাই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় তুলনামূলক রাজনীতি এক অপরিহার্য অধ্যায়।
“তুলনামূলক রাজনীতি হলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ।”
তুলনামূলক রাজনীতির আধুনিক গবেষণা ১৯৫০-৬০-এর দশকে শুরু হয়, বিশেষ করে গ্যাব্রিয়েল আলমন্ড ও সিডনি ভার্বার কাজের মাধ্যমে। ২০২০ সালের “ডেমোক্রেসি ইনডেক্স” অনুযায়ী, নরওয়ে (৯.৮১ স্কোর) সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশ, আর উত্তর কোরিয়া (১.০৮) সর্বনিম্ন। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের প্রতিবেদন বলছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো শীর্ষে, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ নিচে। তুলনামূলক গবেষণা ছাড়া এসব তথ্য বোঝা সম্ভব হতো না।

