- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিশ্বায়নের ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও যোগাযোগে নতুন সুযোগ পেয়েছে। তবে এর সঙ্গে বৈদেশিক নির্ভরতা, সাংস্কৃতিক চাপ, বৈষম্য ও দেশীয় শিল্পের সংকটও বেড়েছে। তাই এর প্রভাব ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের।
তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের উপর বিশ্বায়নের অভিঘাতসমূহ:
১। বাণিজ্য সম্প্রসারণ: বিশ্বায়নের ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে সহজে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে। রপ্তানি ও আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ও ব্যবসার ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২। বিদেশি বিনিয়োগ: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বিশ্বায়নের ফলে বেড়েছে। নতুন শিল্প, কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পুঁজি ও প্রযুক্তির আগমন ঘটে। এতে উৎপাদন বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়।
৩। প্রযুক্তি বিস্তার: বিশ্বায়নের মাধ্যমে উন্নত দেশের আধুনিক প্রযুক্তি দ্রুত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পৌঁছেছে। কৃষি, শিল্প, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। এতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সময় ও ব্যয় সাশ্রয় এবং বিভিন্ন সেবার মান উন্নত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
৪। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: বিদেশি শিল্প, পোশাক খাত, সেবা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসার সম্প্রসারণ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বহু মানুষ দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে পরিবারে আয় বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে দারিদ্র্য হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
৫। শিক্ষার প্রসার: বিশ্বায়নের ফলে বিদেশি শিক্ষা, গবেষণা, অনলাইন কোর্স ও আন্তর্জাতিক বৃত্তির সুযোগ সহজ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা উন্নত দেশের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে। এতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
৬। যোগাযোগ উন্নয়ন: ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার প্রসার তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর যোগাযোগে বড় পরিবর্তন এনেছে। ব্যবসা, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ দ্রুত ও সহজ হয়েছে। তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদান মানুষের জ্ঞান বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও গতিশীল করেছে।
৭। দারিদ্র্য হ্রাস: বিশ্ববাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ফলে কিছু উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্য কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন শিল্প ও সেবা খাতে কাজের সুযোগ মানুষের আয় বাড়িয়েছে। তবে এই সুবিধা সব অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমানভাবে পৌঁছায়নি, ফলে বৈষম্য রয়ে গেছে।
৮। জীবনমান উন্নয়ন: বিশ্বায়নের ফলে উন্নত চিকিৎসা, আধুনিক পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন সেবা তৃতীয় বিশ্বের মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়েছে। মানুষ নতুন জীবনধারা ও সুযোগের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।
৯। দেশীয় শিল্প ক্ষতি: বিদেশি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অনেক স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দুর্বল হয়ে পড়ে। কম দামে বা উন্নত মানের বিদেশি পণ্য বাজার দখল করলে দেশীয় উৎপাদকরা ক্ষতির মুখে পড়ে। এতে কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং স্থানীয় অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে।
১০। অর্থনৈতিক নির্ভরতা: বিশ্বায়নের ফলে অনেক তৃতীয় বিশ্বের দেশ বৈদেশিক ঋণ, আমদানি, প্রযুক্তি ও বিদেশি বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট দেখা দিলে এসব দেশের অর্থনীতি দ্রুত প্রভাবিত হয়। ফলে স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে পড়ে।
১১। আয় বৈষম্য: বিশ্বায়নের সুবিধা সমাজের সব মানুষ সমানভাবে পায় না। ধনী, শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী বেশি সুযোগ পেলেও দরিদ্র ও অদক্ষ মানুষ পিছিয়ে পড়ে। এতে আয় ও সম্পদের ব্যবধান বাড়ে এবং সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
১২। শ্রম শোষণ: কম মজুরির কারণে অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তৃতীয় বিশ্বের দেশে উৎপাদন কার্যক্রম চালায়। কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কম বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে হয়। শ্রম আইন দুর্বলভাবে প্রয়োগ হলে বিশ্বায়ন শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
১৩। মেধা পাচার: উন্নত দেশে বেশি বেতন, উন্নত গবেষণা ও ভালো জীবনযাত্রার সুযোগ থাকায় দক্ষ পেশাজীবীরা দেশত্যাগ করেন। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও গবেষক হারালে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো মানবসম্পদের সংকটে পড়ে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের গতি দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
১৪। সাংস্কৃতিক চাপ: বিশ্বায়নের মাধ্যমে বিদেশি ভাষা, পোশাক, বিনোদন ও জীবনধারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বিদেশি সংস্কৃতির অতিরিক্ত প্রভাব বাড়লে নিজস্ব পরিচয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দুর্বল হতে পারে।
১৫। কৃষি সংকট: আন্তর্জাতিক বাজার ও বিদেশি কৃষিপণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তৃতীয় বিশ্বের ক্ষুদ্র কৃষকেরা সমস্যায় পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বেশি অথচ বাজারদর কম হলে তারা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ফলে কৃষি থেকে মানুষ সরে যেতে পারে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে।
১৬। পরিবেশের ক্ষতি: বিদেশি বিনিয়োগ ও দ্রুত শিল্পায়নের ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশে পরিবেশ দূষণ বেড়েছে। বন উজাড়, শিল্পবর্জ্য, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ ও কার্বন নিঃসরণ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। দুর্বল পরিবেশ আইন থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি সৃষ্টি হতে পারে।
১৭। রাজনৈতিক প্রভাব: বিশ্বায়নের ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থা, দাতা দেশ ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অনেক তৃতীয় বিশ্বের দেশের নীতিনির্ধারণে বেড়েছে। ঋণ, বিনিয়োগ ও সহায়তার শর্তের কারণে সরকার কখনো নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে বাধার মুখে পড়ে। এতে রাষ্ট্রের নীতিগত স্বাধীনতা কিছু ক্ষেত্রে সীমিত হতে পারে।
উপসংহার: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য বিশ্বায়ন একদিকে উন্নয়ন, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে বৈষম্য, নির্ভরতা ও সাংস্কৃতিক চাপ বাড়িয়েছে। তাই সুফল গ্রহণের পাশাপাশি দেশীয় শিল্প, শ্রম অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।