- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: দ্বি-দলীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রধানত দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এই ব্যবস্থা স্থিতিশীল সরকার, শক্তিশালী বিরোধী দল ও দ্রুত সিদ্ধান্তের সুযোগ সৃষ্টি করলেও সীমিত রাজনৈতিক বিকল্প এবং অতিরিক্ত দলীয় মেরুকরণের মতো কিছু সমস্যাও তৈরি করে।
দ্বি-দলীয় ব্যবস্থার দোষ-গুণসমূহ:
১। স্থিতিশীল সরকার: দ্বি-দলীয় ব্যবস্থায় সাধারণত একটি দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে পারে। ফলে জোটের ওপর নির্ভরতা কম থাকে এবং সরকার তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়। দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও এই স্থিতিশীলতা সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
২। শক্তিশালী বিরোধী দল: একটি দল সরকার গঠন করলে অন্য প্রধান দল শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। বিরোধী দল সরকারের নীতি, ব্যয় ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। এতে সরকারকে নিয়মিত জবাবদিহির মধ্যে রাখা যায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কমে।
৩। দ্রুত সিদ্ধান্ত: সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরিষ্কার থাকায় সরকার গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতি দ্রুত পাস করতে পারে। ছোট ছোট দলের সমর্থন পাওয়ার জন্য দীর্ঘ দরকষাকষির প্রয়োজন হয় না। ফলে জরুরি পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট বা জাতীয় সমস্যায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
৪। সহজ সরকার গঠন: নির্বাচনের ফল সাধারণত স্পষ্ট হওয়ায় কে সরকার গঠন করবে তা নির্ধারণ করা সহজ হয়। জোট গঠনের দীর্ঘ আলোচনা বা অনিশ্চয়তা তুলনামূলক কম থাকে। এর ফলে ক্ষমতা হস্তান্তর সহজ হয় এবং সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়।
৫। নীতি স্পষ্টতা: প্রধান দুই দলের নীতি, কর্মসূচি ও রাজনৈতিক অবস্থান সাধারণত ভোটারদের সামনে স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়। ফলে জনগণ সহজে বিকল্পগুলোর তুলনা করতে পারে। নির্বাচনে কোন দলকে সমর্থন করলে কী ধরনের সরকার পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে ভোটারদের ধারণা তুলনামূলক পরিষ্কার থাকে।
৬। জবাবদিহি সহজ: সরকার ব্যর্থ হলে কোন দল দায়ী তা জনগণের কাছে সহজে বোঝা যায়। বহু দল বা জোট সরকারের মতো দায় ভাগাভাগির সুযোগ কম থাকে। তাই নির্বাচনে ভোটাররা সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার ভিত্তিতে সরাসরি শাসক দলকে পুরস্কৃত বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
৭। ক্ষমতা পরিবর্তন: দ্বি-দলীয় ব্যবস্থায় সাধারণত দুই প্রধান দল পালাক্রমে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পায়। ফলে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার পরিবর্তনের একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়মিত হলে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং সাংবিধানিক শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
৮। চরমপন্থা কমে: নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেতে হলে দুই প্রধান দলকেই সমাজের বিস্তৃত অংশের সমর্থন অর্জন করতে হয়। ফলে তারা অনেক সময় অতিরিক্ত চরমপন্থী অবস্থান এড়িয়ে মধ্যপন্থী নীতি গ্রহণ করে। এতে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আপেক্ষিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকতে পারে।
৯। বিকল্পের সীমাবদ্ধতা: দ্বি-দলীয় ব্যবস্থার বড় অসুবিধা হলো ভোটারদের সামনে কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প কম থাকে। দুই প্রধান দলের নীতি পছন্দ না হলেও জনগণ প্রায়শ তাদের মধ্য থেকেই একটি বেছে নিতে বাধ্য হয়। এতে রাজনৈতিক বহুমত ও মতাদর্শের পূর্ণ প্রতিফলন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
১০। ছোট দলের দুর্বলতা: ছোট রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ কম পায়। তাদের নীতি ও দাবি জনপ্রিয় হলেও নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে প্রতিনিধিত্ব সীমিত হতে পারে। ফলে সংখ্যালঘু মত, আঞ্চলিক স্বার্থ বা নতুন রাজনৈতিক চিন্তার যথাযথ প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
১১। দলীয় মেরুকরণ: দুটি প্রধান দল পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রতিটি দল অন্য দলকে পরাজিত করাকে প্রধান লক্ষ্য করলে সমঝোতা ও সহযোগিতা কমে যায়। এতে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয় এবং সমাজেও বিভাজন সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
১২। দলীয় সংঘাত: ক্ষমতা দখল ও ধরে রাখার প্রতিযোগিতা কখনো কখনো দুই দলের মধ্যে তীব্র সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। নীতি ও জনস্বার্থের পরিবর্তে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার প্রবণতা বাড়লে সংসদীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর ফলে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তেজনাপূর্ণ ও অনাস্থাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
১৩। সংখ্যালঘু উপেক্ষা: দুটি বড় দল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ায় ছোট জাতিগত, ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীর বিশেষ দাবি উপেক্ষিত হতে পারে। তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হলে নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও স্বার্থ যথাযথ গুরুত্ব নাও পেতে পারে।
১৪। নতুন দলের বাধা: দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হওয়া কঠিন হয়। অর্থ, সংগঠন, গণমাধ্যম ও ভোটারভিত্তিতে পুরোনো দুই দলের প্রাধান্য নতুন দলের সামনে বড় বাধা সৃষ্টি করে। ফলে নতুন নেতৃত্ব ও নতুন রাজনৈতিক ধারণার বিকাশ সীমিত হতে পারে।
১৫। দলীয় আনুগত্য: দুই দলের তীব্র প্রতিযোগিতায় সদস্যদের মধ্যে অন্ধ দলীয় আনুগত্য তৈরি হতে পারে। দলীয় সিদ্ধান্তকে জাতীয় স্বার্থের ওপরে স্থান দিলে গঠনমূলক সমালোচনা দুর্বল হয়। সংসদ সদস্যরাও অনেক সময় নিজের মতের পরিবর্তে কেবল দলীয় অবস্থান অনুসরণ করতে বাধ্য হন।
১৬। নীতির পরিবর্তন: পালাক্রমে দুই দল ক্ষমতায় এলে নতুন সরকার পূর্ববর্তী সরকারের নীতি পরিবর্তন করতে পারে। বিশেষ করে দলগুলোর আদর্শগত পার্থক্য বেশি হলে উন্নয়ন, অর্থনীতি বা পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
১৭। দ্বৈত আধিপত্য: দীর্ঘদিন দুটি দলই রাজনীতিতে প্রাধান্য ধরে রাখলে রাজনৈতিক ক্ষমতা কার্যত তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে গণতন্ত্র থাকলেও বিকল্প নেতৃত্ব ও নতুন দলের সুযোগ কমে যায়। ফলে রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক হলেও একটি সংকীর্ণ কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে।
উপসংহার: দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা স্থিতিশীল সরকার, শক্তিশালী বিরোধী দল, দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সহজ ক্ষমতা পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে সীমিত বিকল্প, ছোট দলের দুর্বলতা, মেরুকরণ ও সংখ্যালঘু মতের কম প্রতিনিধিত্ব এর বড় অসুবিধা। কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থাকলে এর সুবিধাগুলো বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।