- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও চিন্তাবিদ বার্ট্রান্ড রাসেল গণতন্ত্র সম্পর্কে এক অনন্য ও বাস্তবসম্মত ধারণা পোষণ করতেন। তিনি গণতন্ত্রকে কেবল একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে দেখেননি, বরং একে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার রক্ষার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। রাসেলের মতে গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ব্যক্তি ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক রাসেলের গণতন্ত্র সম্পর্কিত ধারণার মূল দিকগুলো কী কী।
১। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ: রাসেলের মতে গণতন্ত্রের প্রধান কাজ হলো ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ বা “দমন” করা, কারণ ক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবেই একচেটিয়া হওয়ার প্রবণতা রাখে। তিনি ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত “পাওয়ার: আ নিউ সোশ্যাল অ্যানালাইসিস” গ্রন্থে লিখেছেন যে গণতন্ত্র একটি যন্ত্র হিসেবে কাজ করে যা ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে এবং স্বৈরাচার প্রতিরোধ করে। রাসেল বিশ্বাস করতেন যে যেখানে গণতন্ত্র রয়েছে, সেখানে এখনও ক্ষমতাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি, তাই গণতন্ত্রের প্রয়োজন। তিনি মনে করতেন যে গণতন্ত্র ব্যক্তি ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে।
২। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা: বার্ট্রান্ড রাসেলের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষা করা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের নিজস্ব মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত। রাসেলের মতে রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যক্তির সৃজনশীল ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশে সহায়তা করা। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে, তবে সমাজের প্রগতি থমকে যায়। তাই তিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে ব্যক্তির মৌলিক চিন্তার স্বাধীনতাকে স্থান দিয়েছেন।
৩। সংখ্যালঘু অধিকার: রাসেল কেবল সংখ্যাগুরুদের শাসন নয়, বরং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে প্রকৃত গণতন্ত্রে প্রতিটি নাগরিকের মত প্রকাশের সমান সুযোগ থাকতে হবে এবং সংখ্যালঘুদের কণ্ঠস্বর যেন দাবিয়ে না দেওয়া হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে গণতন্ত্রে “সংখ্যাগুরুদের স্বৈরাচার” (tyranny of the majority) এর ঝুঁকি থাকে, যা ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য হুমকি। তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
৪। রাজনৈতিক সহনশীলতা: রাসেল গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতাকে অপরিহার্য মনে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বিভিন্ন মতাদর্শ ও বিশ্বাসের মধ্যে সংলাপ ও সহঅবস্থান গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাসেলের মতে গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতকে স্বাগত জানানো উচিত, কারণ এটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও সামাজিক প্রগতির জন্য প্রয়োজনীয়। তিনি মনে করতেন যে সহনশীলতা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না এবং এটি স্বৈরাচারের দিকে ধাবিত হতে পারে।
৫। শিক্ষার গুরুত্ব: রাসেল গণতন্ত্রের সফলতার জন্য শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তাঁর মতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকদের সচেতন ও শিক্ষিত হওয়া জরুরি, কারণ অশিক্ষিত নাগরিকরা সহজেই কুসংস্কার ও ভুল প্রচারের শিকার হতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষা মানুষকে যুক্তিবাদী চিন্তা করতে শেখায় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে। রাসেলের মতে গণতন্ত্রের শিক্ষামূলক প্রভাব রয়েছে—এটি ভোটারদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও নাগরিক চেতনা জাগ্রত করে।
৬। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র: রাসেল প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন, যেখানে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। তিনি মনে করতেন যে আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রে সরাসরি গণতন্ত্র বাস্তবসম্মত নয়, তাই প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে তিনি সতর্ক করেছিলেন যে প্রতিনিধিরা যেন জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি হয় এবং তাদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হয়। রাসেল বিশ্বাস করতেন যে প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ভোট দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ন্যায্য হতে হবে।
৭। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র: রাসেল কেবল রাজনৈতিক গণতন্ত্র নয়, বরং অর্থনৈতিক গণতন্ত্রেরও পক্ষে ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ছাড়া পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। রাসেল গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন, যা তিনি মার্কসের সাম্রাজ্যবাদী কমিউনিজমের বিকল্প হিসেবে দেখতেন। তাঁর মতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার গণতান্ত্রিক বণ্টন প্রয়োজন, যাতে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য কমে আসে এবং সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
৮। বিশ্ব গণতন্ত্র: রাসেল আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গণতন্ত্রের প্রসার চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রতিটি জাতির গণতান্ত্রিক হওয়া উচিত এবং একটি বিশ্ব গভর্নিং বডিতে জাতিগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকা উচিত। রাসেলের মতে বিশ্ব শান্তি ও সহযোগিতার জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আন্তর্জাতিক প্রসার প্রয়োজন। তিনি মনে করতেন যে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা কম থাকে এবং গণতন্ত্র বিশ্ব শান্তির জন্য সহায়ক।
উপসংহার: সব মিলিয়ে বার্ট্রান্ড রাসেলের গণতন্ত্র সম্পর্কিত ধারণা ছিল গভীর, বাস্তবসম্মত ও মানবতাবাদী। তিনি গণতন্ত্রকে কেবল একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে দেখেননি, বরং একে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা, সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। রাসেলের মতে গণতন্ত্রের সফলতার জন্য শিক্ষা, রাজনৈতিক সহনশীলতা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রসার অপরিহার্য। তাঁর এই ধারণাগুলো আজও গণতান্ত্রিক তত্ত্ব ও অনুশীলনের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।