- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা:- কালের স্রোতে মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে বহু পরিবর্তন, আর এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে আমাদের সবচেয়ে আপন আশ্রয়স্থল পরিবার এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বিবাহinstitutions-এ। একান্নবর্তী পরিবারের সেই চিরায়ত রূপ আজ অনেকটাই ফিকে, স্থান করে নিচ্ছে ছোট একক পরিবার। বিবাহের ধ্যানধারণায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন, যেখানে প্রেম, বন্ধুত্ব, এবং ব্যক্তিগত পছন্দ ক্রমশঃ প্রাধান্য পাচ্ছে। এই নিবন্ধে আমরা পরিবার ও বিবাহের সেই পরিবর্তনশীল রূপের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করব, যা সময়ের সাথে সাথে আমাদের সমাজকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
পরিবার ও বিবাহের পরিবর্তনশীল রূপ:-
১. একান্নবর্তী পরিবার থেকে একক পরিবার: পূর্বেকার দিনে বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবার ছিল সমাজের মূল ভিত্তি, যেখানে একাধিক প্রজন্ম একসাথে বসবাস করত। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তার তাগিদে এই ধরনের পরিবার ছিল অপরিহার্য। কিন্তু শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ফলে এই কাঠামো ভেঙে ছোট একক পরিবারে রূপান্তরিত হচ্ছে। যেখানে স্বামী, স্ত্রী ও তাদের সন্তানরাই মূল সদস্য। বাংলাদেশেও এই চিত্র লক্ষণীয়, যেখানে যৌথ পরিবারের সংখ্যা ক্রমশঃ হ্রাস পাচ্ছে (বিবিএস জরিপ)।
২. বিবাহের বয়স বৃদ্ধি: শিক্ষা ও কর্মজীবনে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের ফলে বিবাহের বয়স ক্রমশঃ বাড়ছে। মেয়েরা এখন ক্যারিয়ার গঠনে অধিক মনোযোগ দিচ্ছে এবং নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর পরেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে আগ্রহী হচ্ছে। ছেলেদের ক্ষেত্রেও পড়াশোনা শেষ করে স্থিতিশীল কর্মজীবনে প্রবেশ করার পরেই বিবাহের সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যাচ্ছে। এই প্রবণতা বাংলাদেশেও সুস্পষ্ট, যেখানে প্রথম বিবাহের গড় বয়স উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে (বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ)।
৩. প্রেম ও পছন্দের বিবাহ: পূর্বে যেখানে পরিবার কর্তৃক নির্ধারিত বিবাহই ছিল প্রধান রীতি, বর্তমানে প্রেম ও ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে বিবাহ ক্রমশঃ জনপ্রিয় হচ্ছে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মেলামেশা এবং সম্পর্ক তৈরির সুযোগ বেড়েছে, যা প্রেম বিবাহের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়ক। শহরাঞ্চলে এই প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
৪. আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃজাতি বিবাহ: সমাজের উদারীকরণ এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার বৃদ্ধির ফলে আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃজাতি বিবাহের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। যদিও এখনও কিছু সামাজিক বাধা বিদ্যমান, তবুও ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে বিবাহবন্ধন একটি ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা।
৫. বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক: বিবাহিত জীবনের বাইরে সম্পর্ক বা লিভ-ইন সম্পর্কের প্রবণতা পশ্চিমা বিশ্বে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত থাকলেও, বর্তমানে বাংলাদেশেও এর কিছু প্রভাব দেখা যাচ্ছে। যদিও এটি এখনও সামাজিক স্বীকৃতি পায়নি, তবে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কিছু তরুণ প্রজন্ম এই ধরনের সম্পর্কে আগ্রহী হচ্ছে।
৬. ডিভোর্স বা বিবাহ বিচ্ছেদের বৃদ্ধি: বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, অর্থনৈতিক চাপ, ব্যক্তিত্বের সংঘাত এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকারের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের হার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন গবেষণা এই প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
৭. সিঙ্গেল মাদার বা একক মাতৃত্ব: বিবাহ বিচ্ছেদ বা অন্য কোনো কারণে একক মায়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারী এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব একা নিতে দ্বিধা করছেন না। এটি সমাজের চিরাচরিত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
৮. সমকামী বিবাহ: বিশ্বের অনেক দেশে সমকামী বিবাহ আইনি স্বীকৃতি লাভ করেছে। যদিও বাংলাদেশে এটি এখনও সামাজিক ও আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়, তবে এলজিবিটিকিউ+ অধিকার আন্দোলনের ফলে এই বিষয়ে আলোচনা ক্রমশঃ বাড়ছে।
৯. সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি: বন্ধ্যা দম্পতিদের জন্য আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) এবং অন্যান্য সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি পরিবার গঠনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে বহু নিঃসন্তান দম্পতি সন্তান লাভের সুযোগ পাচ্ছেন।
১০. প্রযুক্তির প্রভাব: ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনলাইন ডেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ম্যাট্রিমোনিয়াল ওয়েবসাইটগুলি এখন বিবাহ ঘটানোর একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।
১১. পারিবারিক সহিংসতা: যদিও এটি নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সুরক্ষার কারণে ভুক্তভোগীরা এখন মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও এর প্রকোপ এখনও উদ্বেগজনক।
১২. যৌতুকের প্রভাব হ্রাস: একসময় যৌতুক বিবাহের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, যা নারী নির্যাতনের অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে যৌতুকের কুপ্রভাব সম্পর্কে মানুষ অবগত হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। যদিও পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি, তবে এর প্রভাব আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
১৩. নারীর ক্ষমতায়ন: শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে। নারীরা এখন তাদের অধিকার সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে সক্ষম হচ্ছেন। এর প্রভাব বিবাহ এবং পারিবারিক জীবনেও স্পষ্ট।
১৪. পুরুষের ভূমিকা পরিবর্তন: পরিবারে পুরুষের চিরাচরিত ভূমিকা পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন অনেক পুরুষ সন্তান প্রতিপালন এবং গৃহস্থালীর কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। পিতৃত্বের ধারণায়ও এসেছে পরিবর্তন, যেখানে সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং তাদের মানসিক বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
১৫. বহুসংস্কৃতির প্রভাব: বিশ্বায়নের যুগে বিভিন্ন সংস্কৃতি একে অপরের সংস্পর্শে আসছে। এর ফলে বিবাহ এবং পারিবারিক রীতিনীতিতে মিশ্র প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্কৃতি থেকে ভালো দিকগুলো গ্রহণ করার প্রবণতা বাড়ছে।
১৬. আইনের পরিবর্তন: বিবাহ ও পরিবার সম্পর্কিত আইনে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন আসছে। নারীর অধিকার রক্ষা, বাল্যবিবাহ রোধ এবং বিবাহ বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে।
১৭. মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব: বর্তমানে পারিবারিক জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
১৮. প্রবীণদের ভূমিকা: একক পরিবারে প্রবীণদের ভূমিকা কিছুটা সীমিত হয়ে গেলেও, তারা এখনও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান পরিবারের সদস্যদের জন্য মূল্যবান সম্পদ। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণরা নিঃসঙ্গতা ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন, যা একটি উদ্বেগের বিষয়।
১৯. ধর্মীয় অনুশাসনের প্রভাব হ্রাস: আধুনিক সমাজে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রভাব কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে বিবাহ এবং জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্ম ব্যক্তিগত পছন্দকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
২০. পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব: ছোট সুখী পরিবারের ধারণার প্রসারের ফলে পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব বেড়েছে। দম্পতিরা এখন সন্তান সংখ্যা সীমিত রাখতে এবং তাদের উন্নত জীবন দিতে আগ্রহী।
২১. ডিজিটাল পরিবার: প্রযুক্তির কল্যাণে পরিবার এখন ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে ভার্চুয়াল জগতে বিস্তৃত। আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং ভার্চুয়াল মাধ্যমে পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা এখন স্বাভাবিক ঘটনা।
উপসংহার:- পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম এবং পরিবার ও বিবাহও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। সময়ের সাথে সাথে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাবে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের রূপান্তর ঘটছে। ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার সংমিশ্রণে পরিবার ও বিবাহের নতুন নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলি একদিকে যেমন নতুন সুযোগ নিয়ে আসছে, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। তবে মূল কথা হলো, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা, বোঝাপড়া এবং সহমর্মিতাই পরিবার ও বিবাহের বন্ধনকে অটুট রাখতে পারে।
একান্নবর্তী পরিবার থেকে একক পরিবার, বিবাহের বয়স বৃদ্ধি, প্রেম ও পছন্দের বিবাহ, আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃজাতি বিবাহ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, ডিভোর্স বা বিবাহ বিচ্ছেদের বৃদ্ধি, সিঙ্গেল মাদার বা একক মাতৃত্ব, সমকামী বিবাহ, সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি, প্রযুক্তির প্রভাব, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের প্রভাব হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, পুরুষের ভূমিকা পরিবর্তন, বহুসংস্কৃতির প্রভাব, আইনের পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব, প্রবীণদের ভূমিকা, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রভাব হ্রাস, পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব এবং ডিজিটাল পরিবার – এই প্রধান বিষয়গুলির মাধ্যমে পরিবার ও বিবাহের পরিবর্তনশীল রূপ প্রতীয়মান হয়।
উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন বৃদ্ধি পাওয়ায় যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সূচনা হয়। ১৯৭০-এর দশকে নারীর কর্মজীবনে প্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিবাহের বয়সে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ১৯৯০-এর দশকে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক এবং বিবাহে নতুন মাত্রা যোগ করে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস)-এর বিভিন্ন রিপোর্টে পরিবার কাঠামো এবং বিবাহের ধরনে পরিবর্তনের সুস্পষ্ট চিত্র দেখা যায়। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত বিভিন্ন আইন (যেমন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০) পারিবারিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে কোভিড-১৯ মহামারীকালে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বিবাহ এবং পারিবারিক যোগাযোগের নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

