- readaim.com
- 0
উত্তর।। মুখবন্ধ: পুঁজিবাদ হলো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদনের উপকরণ (যেমন: কারখানা, যন্ত্রপাতি, জমি) ব্যক্তিমালিকানায় থাকে এবং মুনাফা অর্জনই এর মূল উদ্দেশ্য। এই ব্যবস্থায় বাজার চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেল, যা নিয়ে নানা বিতর্কও রয়েছে।
শাব্দিক অর্থ:
“পুঁজিবাদ” শব্দটি “পুঁজি” (মূলধন) ও “বাদ” (তত্ত্ব বা ব্যবস্থা) শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। অর্থাৎ, এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মূলধনের মালিকানাই অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
পুঁজিবাদ এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের উপকরণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকে, সরকারের হস্তক্ষেপ সীমিত থাকে এবং বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য ও সেবার বিনিময় ঘটে।
১। অ্যাডাম স্মিথ: “পুঁজিবাদ হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের মাধ্যমে ‘অদৃশ্য হাত’ (Invisible Hand) স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং সামগ্রিক সমৃদ্ধি আনে।” (Capitalism is a system where the “invisible hand” of self-interest automatically regulates the market.)
২। কার্ল মার্ক্স: “পুঁজিবাদ হলো শোষণের একটি ব্যবস্থা, যেখানে পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value) থেকে মুনাফা অর্জন করে।” (Capitalism is a system of exploitation where capitalists profit from the surplus value of labor.)
৩। ম্যাক্স ওয়েবার: “পুঁজিবাদ হলো যুক্তিসঙ্গত লাভের জন্য সংগঠিত একটি অর্থনৈতিক কার্যকলাপ।” (Capitalism is an economic activity organized for rational profit.)
৪। জন মেনার্ড কেইনস: “পুঁজিবাদে বেসরকারি বিনিয়োগই অর্থনীতির চালিকাশক্তি, তবে মন্দা এড়াতে সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।” (In capitalism, private investment drives the economy, but government intervention is needed to prevent recessions.)
৫। মিল্টন ফ্রিডম্যান: “পুঁজিবাদ হলো ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বাধীনতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা, যেখানে মুক্ত বাজারই সর্বোত্তম সমাধান দেয়।” (Capitalism is a system based on individual economic freedom, where the free market provides the best solutions.)
৬। জোসেফ শুম্পিটার: “পুঁজিবাদ হলো ‘সৃষ্টিশীল ধ্বংস’-এর (Creative Destruction) মাধ্যমে উদ্ভাবন ও উন্নয়নের চক্র।” (Capitalism is a cycle of innovation and development through “creative destruction”.)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, পুঁজিবাদ হলো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের মাধ্যমগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন, বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় চাহিদা ও যোগানের মাধ্যমে এবং মুনাফা অর্জনই এর প্রধান লক্ষ্য।
পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য
১। ব্যক্তিগত মালিকানা: পুঁজিবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত মালিকানা। এই ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণ যেমন – জমি, কারখানা, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য সম্পদ ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকে। সরকার সাধারণত এগুলোর ওপর হস্তক্ষেপ করে না, বরং মালিকদের স্বাধীনতা দেয় তাদের সম্পদ ব্যবহার, বিক্রি বা হস্তান্তর করার জন্য। এই ব্যক্তিগত মালিকানার কারণে মানুষ তার সম্পদ বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত হয়, যা সমাজে উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায় এবং দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
২। মুনাফা অর্জন: পুঁজিবাদের প্রধান চালিকাশক্তি হলো মুনাফা অর্জন। প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তার পণ্য বা সেবা বিক্রি করে সর্বোচ্চ মুনাফা লাভের চেষ্টা করে। এই মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যই উদ্যোক্তাদের নতুন নতুন পণ্য বা সেবা তৈরির জন্য অনুপ্রাণিত করে। এটি ব্যবসার সম্প্রসারণে সাহায্য করে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। যখন একটি প্রতিষ্ঠান লাভজনক হয়, তখন তার মালিক আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারে, যা অর্থনৈতিক চক্রকে সচল রাখে। মুনাফা অর্জনের এই প্রবণতা পুঁজিবাদের অন্যতম মূল ভিত্তি।
৩। মুক্ত বাজার অর্থনীতি: মুক্ত বাজার পুঁজিবাদের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। এই ব্যবস্থায় পণ্য ও সেবার দাম সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হয় না, বরং চাহিদা ও সরবরাহের পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ক্রেতারা তাদের পছন্দ অনুযায়ী পণ্য কিনতে পারে এবং বিক্রেতারা স্বাধীনভাবে তাদের পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারে। এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যে প্রতিষ্ঠান কম খরচে ভালো মানের পণ্য সরবরাহ করতে পারে, তারাই টিকে থাকে। এর ফলে ক্রেতারা কম দামে ভালো জিনিস পায় এবং বিক্রেতারা নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে উৎসাহিত হয়।
৪। প্রতিযোগিতা: পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রাণ হলো তীব্র প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একই ধরনের পণ্য বা সেবা নিয়ে বাজারে আসে এবং একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এই প্রতিযোগিতা পণ্যের গুণগত মান উন্নত করতে, দাম কমাতে এবং নতুন নতুন উদ্ভাবন আনতে সাহায্য করে। যে প্রতিষ্ঠান বেশি কার্যকর ও দক্ষ, তারাই এই প্রতিযোগিতায় সফল হয়। এই প্রতিযোগিতা ভোক্তাদের জন্য উপকারী, কারণ তারা তাদের চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্ন বিকল্প পায়। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য।
৫। শ্রমের মজুরি: পুঁজিবাদের অধীনে শ্রমকে একটি পণ্য হিসেবে দেখা হয়। শ্রমিকের মজুরি নির্ধারিত হয় বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে। যদি দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বেশি থাকে, তবে তাদের মজুরি বাড়ে। আবার, যদি শ্রমিকের সরবরাহ বেশি থাকে, তবে মজুরি কমে যেতে পারে। এটি পুঁজিবাদের একটি বিতর্কিত দিক, কারণ অনেক সময় শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তবে, মুক্ত বাজারে শ্রমিকরাও তাদের দক্ষতা বাড়িয়ে ভালো মজুরি পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
৬। মূলধনের অবাধ চলাচল: পুঁজিবাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো মূলধনের অবাধ চলাচল। এর মানে হলো বিনিয়োগকারীরা কোনো সরকারি বাধা ছাড়াই তাদের মূলধন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা এক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তর করতে পারে। এই স্বাধীনতা অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ায়, কারণ মূলধন সবচেয়ে লাভজনক খাতে প্রবাহিত হয়। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকেও সহজ করে তোলে, যা বিশ্ব অর্থনীতির একত্রীকরণে সাহায্য করে। এর ফলে নতুন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
৭। স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থা: পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দাম নির্ধারণের জন্য কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ থাকে না। বরং, চাহিদা ও সরবরাহের পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয়। যখন কোনো পণ্যের চাহিদা বাড়ে, তখন তার দামও বাড়ে। আবার, সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যায়। এই স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থা একটি সূচক হিসেবে কাজ করে, যা উৎপাদকদের জানায় কোন পণ্য কতটা উৎপাদন করা উচিত। এটি অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৮। উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবন: পুঁজিবাদ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি উর্বর ভূমি। এখানে ব্যক্তিরা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করতে উৎসাহিত হয়। মুনাফার লোভ তাদের ঝুঁকি নিতে এবং নতুন পণ্য বা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে অনুপ্রাণিত করে। এই উদ্ভাবনশীলতা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানও উন্নত করে। স্টিভ জবস বা বিল গেটসের মতো উদ্যোক্তারা পুঁজিবাদের মাধ্যমেই তাদের উদ্ভাবন বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন।
৯। সীমিত সরকারি হস্তক্ষেপ: পুঁজিবাদের মূলনীতি হলো সরকার অর্থনীতিতে সীমিত হস্তক্ষেপ করবে। সরকার শুধু আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করা এবং চুক্তি কার্যকর করার মতো মৌলিক দায়িত্ব পালন করে। তবে, বাজারকে সম্পূর্ণ তার নিজের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, যাতে চাহিদা ও সরবরাহের নিয়ম অনুযায়ী সবকিছু পরিচালিত হয়। এই সীমিত হস্তক্ষেপের কারণে ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং মুক্ত প্রতিযোগিতা উৎসাহিত হয়।
১০। শ্রেণি বৈষম্য: পুঁজিবাদী সমাজে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য একটি সাধারণ ঘটনা। যেহেতু মুনাফা অর্জনের প্রধান লক্ষ্য থাকে, তাই ধনীরা আরও ধনী হয় এবং গরিবরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এতে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট শ্রেণি বিভাজন দেখা যায়। এই বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে এবং অনেক সময় সামাজিক সুবিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি পুঁজিবাদের একটি প্রধান সমালোচনা।
১১। অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য: পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবা উৎপাদন করা হয়। প্রতিযোগিতা এবং মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য থাকার কারণে উদ্যোক্তারা ভোক্তাদের চাহিদার ভিত্তিতে নতুন নতুন পণ্য সরবরাহ করতে উৎসাহিত হয়। এর ফলে বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য দেখা যায়, যা ভোক্তাদের জন্য উপকারী। তারা তাদের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন বিকল্প থেকে বেছে নিতে পারে। এটি অর্থনৈতিক কাঠামোর স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করে।
১২। ভোক্তার সার্বভৌমত্ব: পুঁজিবাদে ভোক্তাকে রাজা হিসেবে গণ্য করা হয়। ভোক্তারা তাদের ক্রয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাজারে কোন পণ্য টিকে থাকবে তা নির্ধারণ করে। যদি কোনো পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে, তবে তার উৎপাদন বাড়ে। অন্যদিকে, যদি কোনো পণ্যের চাহিদা কমে যায়, তবে তার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে ভোক্তার সার্বভৌমত্ব বলা হয়, যা উৎপাদকদের ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে বাধ্য করে।
১৩। যোগান ও চাহিদা: পুঁজিবাদের মূল ভিত্তি হলো যোগান ও চাহিদার সূত্র। এই সূত্র অনুযায়ী, যখন কোনো পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে কিন্তু যোগান কম, তখন তার দাম বাড়ে। আবার, যখন যোগান বেশি থাকে কিন্তু চাহিদা কম, তখন তার দাম কমে যায়। এই সূত্র বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং উৎপাদকদের জন্য একটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। এটি বাজারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হতে সাহায্য করে।
১৪। উচ্চ উৎপাদনশীলতা: পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা এবং মুনাফার তাড়না প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে উৎসাহিত করে। নতুন প্রযুক্তি এবং উন্নত কর্মপদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো কম খরচে বেশি পণ্য উৎপাদন করতে চেষ্টা করে। এর ফলে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে। উচ্চ উৎপাদনশীলতা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের জন্য কম দামে ভালো মানের পণ্য নিশ্চিত করে।
১৫। অর্থনৈতিক চক্র: পুঁজিবাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো অর্থনৈতিক চক্র। এই চক্রে উত্থান (boom) এবং মন্দা (bust) দুটি পর্যায় থাকে। যখন অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তখন একে উত্থান বলা হয়। আবার যখন প্রবৃদ্ধি কমে যায়, তখন মন্দা দেখা দেয়। এই চক্রটি পুঁজিবাদের একটি স্বাভাবিক অংশ। সরকার বিভিন্ন নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে এই চক্রের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করে।
১৬। স্বাধীনতা ও পছন্দ: পুঁজিবাদ ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং পছন্দের ওপর জোর দেয়। ব্যক্তিরা তাদের পেশা, বিনিয়োগ এবং ভোগ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই স্বাধীনতা তাদের নিজেদের ভাগ্য গড়ার সুযোগ দেয়। ভোক্তারা তাদের রুচি ও বাজেট অনুযায়ী পণ্য বা সেবা বেছে নিতে পারে। এই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা পুঁজিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক ভিত্তি।
১৭। ঝুঁকি গ্রহণ: পুঁজিবাদী সমাজে ঝুঁকি গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদ্যোক্তারা মুনাফা লাভের আশায় নতুন ব্যবসা শুরু করার ঝুঁকি নেয়। এই ঝুঁকি গ্রহণের ফলেই নতুন শিল্প এবং প্রযুক্তি গড়ে ওঠে। যারা সফলভাবে ঝুঁকি নেয়, তারা বড় লাভ করে। আবার, যারা ব্যর্থ হয়, তারা তাদের মূলধন হারাতে পারে। এই ঝুঁকি গ্রহণ পুঁজিবাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে টিকিয়ে রাখে।
১৮। বাজারের ব্যর্থতা: পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কিছু ক্ষেত্রে বাজার তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হতে পারে। যেমন, কিছু পণ্য বা সেবা (যেমন জনস্বাস্থ্য) ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান দ্বারা পর্যাপ্তভাবে সরবরাহ করা নাও হতে পারে। এছাড়া, দূষণ বা অন্যান্য বাহ্যিকতা (externalities) মোকাবিলায় বাজার ব্যর্থ হতে পারে। এই ধরনের ব্যর্থতা পূরণের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে।
১৯। সম্পদের অসম বন্টন: পুঁজিবাদের একটি প্রধান নেতিবাচক দিক হলো সম্পদের অসম বন্টন। মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত হওয়ায় সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। এর ফলে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এটি সামাজিক অস্থিরতা ও শ্রেণীসংঘাতের জন্ম দেয়।
২০। ভোগবাদ: পুঁজিবাদ মানুষকে আরও বেশি পণ্য ও সেবা ভোগ করতে উৎসাহিত করে। বিজ্ঞাপন এবং বিপণনের মাধ্যমে নতুন নতুন চাহিদা তৈরি করা হয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে ভোগবাদী মানসিকতা বাড়ে। অতিরিক্ত ভোগ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং পরিবেশের ক্ষতি করে।
২১। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য: পুঁজিবাদ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করে। যেহেতু মূলধন এবং পণ্য অবাধে চলাচল করতে পারে, তাই দেশগুলো একে অপরের সাথে বাণিজ্য করতে পারে। এর ফলে দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়ে এবং বিশ্ব অর্থনীতি আরও সংযুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার: পুঁজিবাদ একটি জটিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ, প্রতিযোগিতা এবং মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য এর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে, এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে, যেমন – শ্রেণি বৈষম্য, সম্পদের অসম বন্টন এবং বাজারের ব্যর্থতা। একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য এই সীমাবদ্ধতাগুলো মোকাবেলা করা জরুরি।
১। 💰 ব্যক্তিগত মালিকানা
২। 📈 মুনাফা অর্জন
৩। 🛒 মুক্ত বাজার অর্থনীতি
৪। 🏆 প্রতিযোগিতা
৫। 💼 শ্রমের মজুরি
৬। 🌐 মূলধনের অবাধ চলাচল
৭। ⚖️ স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থা
৮। 💡 উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবন
৯। 🏛️ সীমিত সরকারি হস্তক্ষেপ
১০। 📊 শ্রেণি বৈষম্য
১১। 🎨 অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য
১২। 👑 ভোক্তার সার্বভৌমত্ব
১৩। ⚖️ যোগান ও চাহিদা
১৪। 🏭 উচ্চ উৎপাদনশীলতা
১৫। 🔄 অর্থনৈতিক চক্র
১৬। 🕊️ স্বাধীনতা ও পছন্দ
১৭। 🎲 ঝুঁকি গ্রহণ
১৮। 📉 বাজারের ব্যর্থতা
১৯। 🌍 সম্পদের অসম বন্টন
২০। 🛍️ ভোগবাদ
২১। 🛳️ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
পুঁজিবাদের উৎপত্তি ১৬শ ও ১৯শ শতকের ইউরোপে বাণিজ্যিক বিপ্লবের সময়। অ্যাডাম স্মিথের ১৭৭৬ সালের বই “The Wealth of Nations”-কে পুঁজিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। শিল্প বিপ্লব (১৮৪০-১৭৬০) পুঁজিবাদের বিকাশে একটি বড় ভূমিকা পালন করে, যখন বাষ্পীয় ইঞ্জিন এবং কারখানার মতো প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়। বিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং শীতল যুদ্ধের সময় (১৯৪৭-১৯৯১) এটি সমাজতন্ত্রের বিপরীতে প্রধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৮৫% পুঁজিবাদী বা মিশ্র-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। পুঁজিবাদ বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে সহায়তা করেছে।

