- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সমাজকর্ম (Social work) হলো সমাজের দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। এই কাজ যখন সুনির্দিষ্ট জ্ঞান, দক্ষতা এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে করা হয়, তখন তা হয় পেশাদার সমাজকর্ম। আর যখন এটি কেবল মানবিক অনুভূতি বা ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে করা হয়, তখন তাকে অপেশাদার সমাজকর্ম বলা যায়। পেশাদার ও অপেশাদার সমাজকর্মের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে যা তাদের কার্যকারিতা এবং উদ্দেশ্যকে ভিন্ন করে তোলে।
১। পদ্ধতি ও কৌশল: পেশাদার সমাজকর্মীরা সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহার করে কাজ করেন। তারা সমস্যা সমাধানের জন্য কেস ওয়ার্ক, গ্রুপ ওয়ার্ক এবং কমিউনিটি অর্গানাইজেশন-এর মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন। এই পদ্ধতিগুলো তাদের কাজকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে, যার ফলে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা এবং কার্যকর সমাধান প্রদান করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, অপেশাদার সমাজকর্মীরা সাধারণত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সহানুভূতি এবং স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে কাজ করেন, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না।
২। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: পেশাদার সমাজকর্মী হতে হলে অবশ্যই স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠান থেকে সমাজকর্ম বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। এই শিক্ষায় তত্ত্বীয় জ্ঞান, ব্যবহারিক দক্ষতা এবং গবেষণা অন্তর্ভুক্ত থাকে। একজন পেশাদার সমাজকর্মী দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ ও সুপারভিশনের মাধ্যমে তার দক্ষতা উন্নত করেন। বিপরীতে, অপেশাদার সমাজকর্মের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। এই কাজের প্রেরণা সাধারণত ব্যক্তিগত আগ্রহ বা মানবিক অনুভূতি থেকে আসে।
৩। পেশাদার সম্পর্ক: পেশাদার সমাজকর্মীরা সেবাগ্রহীতাদের সাথে একটি সুনির্দিষ্ট এবং নৈতিক পেশাদার সম্পর্ক বজায় রাখেন। এই সম্পর্কটি সহমর্মিতা, নিরপেক্ষতা এবং গোপনীয়তার নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়। তারা ব্যক্তিগত অনুভূতিকে পেশাগত সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলতে দেন না। অপেশাদার সমাজকর্মের ক্ষেত্রে, সম্পর্কটি প্রায়শই ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল হয়, যেখানে আবেগ বা পক্ষপাতিত্ব কাজ করতে পারে। এতে সেবাগ্রহীতার সাথে সম্পর্কের স্বচ্ছতা বজায় রাখা কঠিন হয়।
৪। কার্যকারিতা ও ফলাফল: পেশাদার সমাজকর্মের কার্যকারিতা পরিমাপযোগ্য এবং এর ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী হয়। পেশাদার সমাজকর্মীরা সমস্যার মূল কারণ নির্ণয় করে এবং এমনভাবে কাজ করেন যাতে সেবাগ্রহীতা স্বাবলম্বী হতে পারে। তাদের কাজ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সহায়তা করে। অপেশাদার সমাজকর্মের কাজ সাধারণত তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এর ফলাফল স্বল্পস্থায়ী হতে পারে।
৫। জবাবদিহিতা: পেশাদার সমাজকর্মীরা তাদের কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট পেশাদার সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন। তাদের কাজের মান, নৈতিকতা এবং কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে যে, তারা উচ্চমানের পরিষেবা প্রদান করছেন। অপেশাদার সমাজকর্মের ক্ষেত্রে, সাধারণত কোনো আনুষ্ঠানিক জবাবদিহিতা থাকে না। তাদের কাজ ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা আবেগের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যার ফলে তাদের কাজের মান বা প্রভাব সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।
৬। নীতিশাস্ত্র ও নৈতিকতা: পেশাদার সমাজকর্মের একটি সুসংগঠিত নীতিশাস্ত্র ও নৈতিক নীতিমালা রয়েছে। পেশাদার সমাজকর্মীরা তাদের কাজে এই নৈতিক নীতিমালা অনুসরণ করেন, যেমন: গোপনীয়তা রক্ষা, সম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখা, এবং পক্ষপাতহীনতা। এই নীতিমালা তাদের কাজের মান এবং সততা নিশ্চিত করে। অপেশাদার সমাজকর্মের ক্ষেত্রে, সুনির্দিষ্ট নৈতিক নীতিমালা না থাকায় ব্যক্তিগত মূল্যবোধ বা বিশ্বাস কাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা অনেক সময় পক্ষপাতমূলক হতে পারে।
৭। কার্যক্ষেত্র: পেশাদার সমাজকর্মীরা সাধারণত সরকারি, বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থা, হাসপাতাল, স্কুল এবং কমিউনিটি সেন্টারের মতো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাদের কাজের পরিধি ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকে। অপেশাদার সমাজকর্মীরা সাধারণত নিজেদের উদ্যোগে বা স্থানীয়ভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কাজ করেন। তাদের কাজের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট না হয়ে বরং সমাজের বিভিন্ন সমস্যা বা জরুরি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
৮। পেশাদার পরিচিতি: পেশাদার সমাজকর্মের একটি সুনির্দিষ্ট পেশাদার পরিচিতি রয়েছে। এর একটি নির্দিষ্ট নাম, ডিগ্রি এবং স্বীকৃত পেশাদার সংস্থা রয়েছে। যারা এই পেশায় নিয়োজিত, তারা সমাজের কাছে সুপরিচিত এবং তাদের কাজের একটি নির্দিষ্ট মর্যাদা রয়েছে। অপেশাদার সমাজকর্মের ক্ষেত্রে, কোনো আনুষ্ঠানিক পেশাদার পরিচিতি বা স্বীকৃতি থাকে না। এটি মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৯। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: পেশাদার সমাজকর্মের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট এবং কৌশলগত। এর উদ্দেশ্য হলো সেবাগ্রহীতাকে স্বাবলম্বী করা এবং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করা। পেশাদার সমাজকর্মীরা শুধু সমস্যা সমাধান করেন না, বরং এর পুনরাবৃত্তি রোধেও কাজ করেন। অপেশাদার সমাজকর্মের প্রধান লক্ষ্য সাধারণত তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা প্রদান করা, যা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর নাও হতে পারে।
১০। কাজের ধরন: পেশাদার সমাজকর্ম হলো একটি পরিকল্পিত এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এটি সমস্যার গভীর বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়ন নিয়ে গঠিত। এই প্রক্রিয়াটি সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে এবং স্থায়ী সমাধানে সহায়তা করে। অপেশাদার সমাজকর্ম হলো একটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়া। এটি সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা প্রদানে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে না।
উপসংহার: পেশাদার সমাজকর্ম এবং অপেশাদার সমাজকর্ম উভয়ই সমাজের কল্যাণে কাজ করে। তবে, তাদের কার্যপদ্ধতি, শিক্ষা ও দক্ষতার দিক থেকে তাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। পেশাদার সমাজকর্ম একটি সুশৃঙ্খল ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সহায়তা করে, অন্যদিকে অপেশাদার সমাজকর্ম মানবিক অনুভূতির ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করে। একটি উন্নত ও কার্যকর সমাজসেবা নিশ্চিত করতে পেশাদার সমাজকর্মের গুরুত্ব অপরিহার্য।
১. পদ্ধতি ও কৌশল ২. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ৩. পেশাদার সম্পর্ক ৪. কার্যকারিতা ও ফলাফল ৫. জবাবদিহিতা ৬. নীতিশাস্ত্র ও নৈতিকতা ৭. কার্যক্ষেত্র ৮. পেশাদার পরিচিতি ৯. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ১০. কাজের ধরন।
১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এ.কে. নাজমুল করিম কর্তৃক সমাজকর্ম বিভাগ চালু হয়, যা বাংলাদেশে পেশাদার সমাজকর্মের পথ উন্মোচন করে। ১৯৫৮ সালে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পেশাদার সমাজকর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করে। জাতিসংঘের এক জরিপ অনুযায়ী, পেশাদার সমাজকর্মীদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রকল্পগুলো অপেশাদার উদ্যোগের চেয়ে প্রায় ৩০% বেশি সফল হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজসেবা অধিদপ্তর ১৯৭৪ সালে জাতীয় সমাজকল্যাণ কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে পেশাদার সমাজকর্মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

