- readaim.com
- 0
উত্তর::শুরু: সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এক অনিবার্য বাস্তবতা। সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন চাহিদা এবং সমস্যার উদ্ভব ঘটে, যার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে প্রশাসনিক কাঠামো ও পদ্ধতির আধুনিকায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এই আধুনিকায়নের প্রক্রিয়াই হলো প্রশাসনিক সংস্কার, যা একটি রাষ্ট্রকে আরও গতিশীল, দক্ষ এবং জনবান্ধব করে তোলার মূল চাবিকাঠি। এটি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূর করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করে।
শাব্দিক অর্থ: “প্রশাসনিক সংস্কার” (Administrative Reform) শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে ‘প্রশাসনিক’ অর্থ প্রশাসন সম্বন্ধীয় বা প্রশাসন সংক্রান্ত এবং ‘সংস্কার’ অর্থ শুদ্ধিকরণ, উন্নয়ন বা बेहतরির জন্য পরিবর্তন। সুতরাং, শাব্দিক অর্থে প্রশাসনিক সংস্কার হলো প্রশাসন ব্যবস্থার শুদ্ধিকরণ বা উন্নয়নমূলক পরিবর্তন।
প্রশাসনিক সংস্কার হলো একটি সচেতন ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সরকারি প্রশাসনের কাঠামো, পদ্ধতি, আইনকানুন এবং কার্যধারার উন্নতি সাধন করে একে সময়োপযোগী, দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী করে তোলা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে জনগণের জন্য কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদান করা। এটি কেবল কাঠামোগত পরিবর্তনই নয়, বরং সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিকতা ও আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তনকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং চিন্তাবিদগণ নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংজ্ঞা উপস্থাপন করা হলো:
১। লুথার গুলিক (Luther Gulick): “প্রশাসনিক সংস্কার হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সংগঠনের কাঠামো, পদ্ধতি এবং কর্মীদের এমনভাবে পুনর্গঠিত করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যসমূহ আরও দক্ষতার সাথে অর্জন করা যায়।” (In English: “Administrative reform is the process by which the structure, procedures, and personnel of an organization are so reconstituted as to achieve more effectively its defined objectives.”)
২। গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ড (Gabriel Almond): তিনি সরাসরি প্রশাসনিক সংস্কারের সংজ্ঞা না দিলেও তাঁর আলোচনা থেকে বোঝা যায়, এটি হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থার দাবি ও সমর্থনের সাথে প্রশাসনিক কাঠামোর সামঞ্জস্য বিধান করার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, যা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। (In English: It is a continuous effort to align the administrative structure with the demands and supports of the political system, thereby enhancing the stability and effectiveness of the system.)
৩। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): তাঁর মতে, “প্রশাসনিক সংস্কার হলো রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবর্তিত সামাজিক শক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা, যা প্রায়শই প্রতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে ঘটে থাকে।” (In English: “Administrative reform is an effort to adapt political and administrative institutions to changing social forces, which often occurs through institutionalization.”)
৪। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ওয়েবারের আমলাতন্ত্রের ধারণা থেকে বলা যায়, প্রশাসনিক সংস্কার হলো যৌক্তিক-আইনি কর্তৃত্বের (rational-legal authority) ভিত্তিতে প্রশাসনকে আরও বিধিবদ্ধ, নিরপেক্ষ এবং দক্ষ করে তোলার প্রচেষ্টা, যা আবেগ ও ব্যক্তিগত প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে। (In new_paragraph: From Weber’s concept of bureaucracy, administrative reform is the effort to make administration more systematic, impartial, and efficient based on rational-legal authority, free from emotion and personal influence.)
৫। অ্যারিস্টটল (Aristotle): প্লেটোর ছাত্র অ্যারিস্টটল সরাসরি প্রশাসনিক সংস্কারের কথা না বললেও, তাঁর ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে একটি উত্তম বা আদর্শ রাষ্ট্রव्यवस्था গঠনের জন্য যে সব নিয়ম-কানুন এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের কথা বলেছেন, তাকে এক ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। তিনি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
৬। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (Niccolò Machiavelli): ম্যাকিয়াভেলির দৃষ্টিতে, শাসকের ক্ষমতা ধরে রাখা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনে প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামোতে যে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনাই হলো সংস্কার। তাঁর কাছে ফলাফলই মুখ্য, এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে গৃহীত পদক্ষেপই সংস্কার। (In English: From Machiavelli’s perspective, reform is any change in the administrative and military structure necessary for the ruler to retain power and ensure the security of the state.)
৭। জাতিসংঘের একটি প্রকাশনা অনুযায়ী (According to a UN Publication): “প্রশাসনিক সংস্কার হলো সরকারি প্রশাসন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, সাংগঠনিক কাঠামো এবং কার্যপ্রণালীর মধ্যে পরিকল্পিত পরিবর্তন আনয়নের একটি কৃত্রিম প্রণোদনা।” (In English: “Administrative reform is the artificial inducement of planned change in the machinery of government, in its purpose, its organizational structure and its operational methods.”)
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, প্রশাসনিক সংস্কার কোনো বিচ্ছিন্ন বা একবারের ঘটনা নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দক্ষ ও যুগোপযোগী প্রশাসন অপরিহার্য। তাই, পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রশাসনিক ব্যবস্থার নিয়মিত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এটিই একটি দেশকে অগ্রগতির পথে চালিত করার অন্যতম প্রধান শক্তি।
প্রশাসনের কার্যকারিতা ও জনসেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত পরিকল্পিত পরিবর্তনই হলো প্রশাসনিক সংস্কার।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য বিভিন্ন সময়ে কমিশন ও কমিটি গঠিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসেস রিঅর্গানাইজেশন কমিটি’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে সংস্কার প্রস্তাব এসেছে। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ১৯৯৭: দ্য স্টেট ইন আ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড’ এবং ২০০২ সালের ‘পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রিফর্ম কমিশন’ রিপোর্ট বিশ্বব্যাপী প্রশাসনিক সংস্কার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।

