- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রস্তাবনা: ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়ের মাত্র ২৫ দিন পর, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে সদ্য স্বাধীন মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ছিল বাঙালি জাতির জন্য এক নতুন আনন্দ, স্বস্তি ও পরিপূর্ণতার প্রতীক। একদিকে যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে, তখন বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন জাতিকে এক নতুন আশায় উজ্জীবিত করেছিল এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অপরিহার্য নেতৃত্ব এনে দিয়েছিল।
১। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিদশা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে, তার পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ ৯ মাস তিনি সেখানে নির্জন কারাবাস করেন এবং তাঁর জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। পাকিস্তান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে গোপন বিচার শুরু করে, যার রায় মৃত্যুদণ্ডও হতে পারত। এই বন্দিদশা ছিল বাঙালি জাতির জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ।
২। বিশ্ব জনমতের চাপ: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তানের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন-সহ অনেক দেশ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে। এই আন্তর্জাতিক চাপ পাকিস্তান সরকারকে বাধ্য করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে, কারণ একটি স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে আটকে রাখা পাকিস্তানের পক্ষে আর সম্ভব ছিল না।
৩। বিজয় ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তি: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন বাঙালি জাতি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে এবং পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, তখনো বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। তবে, বাংলাদেশের বিজয়ের পর তাঁর মুক্তি ছিল সময়ের ব্যাপার। বিশ্ব জনমতের প্রবল চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এটি ছিল নবগঠিত বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় বিজয়।
৪। লন্ডন হয়ে ঢাকা যাত্রা: পাকিস্তান থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরাসরি বাংলাদেশে আসেননি। প্রথমে তাঁকে পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে করে লন্ডন পাঠানো হয়। ১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারি তিনি লন্ডনে পৌঁছান এবং সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ-সহ বিশ্বনেতাদের সাথে কথা বলেন। লন্ডন থেকে তিনি ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে করে ভারতের দিল্লি হয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন।
৫। দিল্লিতে উষ্ণ সংবর্ধনা: লন্ডনে যাত্রা বিরতির পর বঙ্গবন্ধু দিল্লি পৌঁছান এবং সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানান। দিল্লিতে তিনি ভারতের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ভারতের সহায়তার প্রশংসা করেন। এটি ছিল ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
৬। ১০ই জানুয়ারি, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন: ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দুপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তেজগাঁও বিমানবন্দরে লাখো জনতা তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিল। বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যান, যেখানে লাখ লাখ অপেক্ষমাণ জনতা তাঁকে একনজর দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।
৭। ঐতিহাসিক ভাষণ ও জাতির আবেগ: রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু এক আবেগঘন ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁর এই ভাষণ ছিল আনন্দ ও বেদনার মিশ্রণ, যা বাঙালি জাতির মনে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এই ভাষণে তিনি জাতিকে পুনর্গঠনের আহ্বান জানান।
৮। জাতি গঠন ও পুনর্গঠনের সূচনা: বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য ছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে একটি অস্থায়ী সরকার (মুজিবনগর সরকার) দেশকে পরিচালিত করছিল। কিন্তু একজন জাতির পিতার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন এবং একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। তাঁর ফিরে আসা দেশকে স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্ব প্রদান করে।
৯। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন: বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়। বিশ্বের অনেক দেশ যারা তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি, তারা বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার পর স্বীকৃতি দিতে শুরু করে। কারণ, একজন বৈধ সরকারপ্রধানের উপস্থিতি একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বৈধতাকে আরও দৃঢ় করে।
১০। জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ: ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর এই দিনটি বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে পালন করে। এটি শুধু একজন নেতার ফিরে আসা নয়, বরং একটি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পরিপূর্ণতা অর্জনের প্রতীক।
উপসংহার: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয়ের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। তাঁর ফিরে আসার মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ হয় এবং জাতি পুনর্গঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস ও প্রেরণা পায়। এই দিনটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন ছিল না, বরং ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক নতুন দিগন্ত। ১০ই জানুয়ারি তাই বাঙালি জাতির হৃদয়ে এক আনন্দ ও গর্বের দিন হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
- 🟢 পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিদশা
- 🔵 বিশ্ব জনমতের চাপ
- 🟠 বিজয় ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তি
- 🟣 লন্ডন হয়ে ঢাকা যাত্রা
- ⚪ দিল্লিতে উষ্ণ সংবর্ধনা
- 🟤 ১০ই জানুয়ারি, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন
- 🟡 ঐতিহাসিক ভাষণ ও জাতির আবেগ
- 🔴 জাতি গঠন ও পুনর্গঠনের সূচনা
- ⚫ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন
- ❇️ জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকেন। ১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার তাকে মুক্তি দিলে তিনি লন্ডন পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে করে ৯ই জানুয়ারি দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, যেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে স্বাগত জানান। অবশেষে ১০ই জানুয়ারি, ১৯৭২ দুপুরে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করে এবং জাতি পুনর্গঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই ঐতিহাসিক দিনে রেসকোর্স ময়দানে তিনি প্রায় ৫ লক্ষ জনতার সামনে ভাষণ দেন।

