- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রস্তাবনা: বাকশাল, যার পূর্ণরূপ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ, ১৯৭৫ সালের শুরুতে গঠিত একটি রাজনৈতিক দল এবং ব্যবস্থা ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দলটি গঠন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি ভিন্ন ধরনের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে দ্রুত অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তবে, এর প্রকৃতি ও প্রভাব নিয়ে আজও বাংলাদেশে ব্যাপক বিতর্ক বিদ্যমান।
বাকশাল বা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ ছিল ১৯৭৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি গঠিত একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করে এই দলটি গঠন করেন। এর আগে, ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী আনা হয়, যার মাধ্যমে সংসদীয় শাসন পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং বহুদলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ খুলে দেওয়া হয়।
বাকশাল গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল যে, এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করবে, দুর্নীতি দমন করবে এবং একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে। এই ব্যবস্থার অধীনে সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং শুধুমাত্র বাকশালই একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃত হয়। রাষ্ট্রের সকল সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে বাকশালের সদস্য হতে বাধ্য করা হয়।
বাকশালের কাঠামোর মধ্যে দেশের সকল পেশাজীবী সংগঠন, যেমন – কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুব, মহিলা – এই দলের সহযোগী সংগঠন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। চারটি দৈনিক পত্রিকা বাদে সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সীমিত করে। বাকশাল ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, যার মাধ্যমে প্রতিটি জেলায় একজন করে গভর্নর নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যদিও এই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বাকশালকে অনেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে দেখেন। সমালোচকদের মতে, এটি গণতন্ত্রকে খর্ব করে একদলীয় স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল। অন্যদিকে, এর সমর্থকরা মনে করেন যে, তৎকালীন জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং দেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটি একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ ছিল। তবে, এই ব্যবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর এই ব্যবস্থার অবসান ঘটে।
উপসংহার: বাকশাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ ছিল। এর উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এটি ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক নতুন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। বাকশাল যদিও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবে এর প্রভাব বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে সুদূরপ্রসারী ছিল। এই ব্যবস্থা একদিকে যেমন দ্রুত উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা আনার স্বপ্ন দেখেছিল, তেমনি অন্যদিকে গণতন্ত্রের প্রশ্নে কিছু গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছিল।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গঠিত একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা।
বাকশাল গঠিত হয় ১৯৭৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি। এর আগে ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী আনা হয়, যার মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হয় এবং বহুদলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। এই সংশোধনীতে বলা হয়েছিল, শুধুমাত্র একটি ‘জাতীয় দল’ থাকবে। ফলস্বরূপ, ১৯৭৫ সালের ৭ই জুন বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ শেখ মুজিবুর রহমান এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। বাকশালের সদস্য হওয়া সরকারি কর্মচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। এটি অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি পদক্ষেপ ছিল। তবে, মাত্র ছয় মাস পরই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং বহুদলীয় রাজনীতি পুনরায় চালু হয়।

