- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হলো হাউস অফ লর্ডস বা লর্ড সভা। এটি বিশ্বের একমাত্র পার্লামেন্ট যার সদস্যদের একটি বড় অংশ বংশানুক্রমিক উপাধিধারী। সময়ের সাথে সাথে লর্ড সভার গঠন অনেক পরিবর্তিত হয়েছে, এবং বর্তমানে এটি প্রধানত তিন ধরনের সদস্য নিয়ে গঠিত: স্পিরিচুয়াল লর্ডস (Lords Spiritual), টেম্পোরাল লর্ডস (Lords Temporal) এবং লর্ডস অফ আপিল (Lords of Appeal)। এই সভা মূলত ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি ঐতিহ্যবাহী এবং সাংবিধানিক অঙ্গ, যা আইন প্রণয়ন, বিতর্ক এবং সরকারের কাজের নিরীক্ষণ করে।
ব্রিটিশ লর্ড সভা বা হাউস অফ লর্ডস একটি জটিল এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এর সদস্যদেরকে পিয়ার (Peer) বলা হয়। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ৮০০-এর বেশি, এবং তাদের নিয়োগ বা নির্বাচন পদ্ধতি বেশ বৈচিত্র্যময়। লর্ড সভার গঠনকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. স্পিরিচুয়াল লর্ডস (Lords Spiritual): এই সদস্যরা হলেন চার্চ অফ ইংল্যান্ডের উচ্চপদস্থ ধর্মগুরু। এর মধ্যে ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ, ইয়র্কের আর্চবিশপ, লন্ডনের বিশপ, ডারহামের বিশপ এবং উইনচেস্টারের বিশপ সহ মোট ২৬ জন বিশপ লর্ড সভার সদস্য। তারা জীবনের জন্য এই পদে আসীন থাকেন এবং তাদের প্রধান কাজ হলো ধর্মীয় এবং নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আইন প্রণয়নের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া। তাদের উপস্থিতি ব্রিটিশ সমাজের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে চার্চের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটায়।
২. টেম্পোরাল লর্ডস (Lords Temporal): এরা হলেন বংশানুক্রমিক বা আজীবন পিয়ার (Hereditary or Life Peers)।
- আজীবন পিয়ার (Life Peers): এটি লর্ড সভার সবচেয়ে বড় অংশ। এই সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পরামর্শ অনুযায়ী রাজা বা রানী কর্তৃক আজীবনের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সাধারণত, অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন পেশার বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। হাউস অফ লর্ডস অ্যাক্ট ১৯৯৯ (House of Lords Act 1999) অনুযায়ী বংশানুক্রমিক পিয়ারদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছে এবং আজীবন পিয়ারদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা লর্ড সভার গঠনকে আরও পেশাদার ও আধুনিক করেছে।
- বংশানুক্রমিক পিয়ার (Hereditary Peers): ঐতিহাসিকভাবে, লর্ড সভার বেশিরভাগ সদস্যই বংশানুক্রমিক ছিলেন, অর্থাৎ তাদের উপাধি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। কিন্তু ১৯৯৯ সালের সংস্কারের পর এই প্রথা প্রায় বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ৯০ জন বংশানুক্রমিক পিয়ার লর্ড সভার সদস্য হিসেবে রয়ে গেছেন। তারা বংশানুক্রমিক পিয়ারদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন, এবং তাদের মূল ভূমিকা হলো সভার ঐতিহ্য ধরে রাখা।
৩. লর্ডস অফ আপিল (Lords of Appeal): এরা হলেন বিচার বিভাগীয় লর্ডস। ঐতিহ্যগতভাবে লর্ড সভা যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আপিল আদালত হিসেবে কাজ করত। বিচারক হিসেবে কাজ করার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত পিয়ারদের লর্ডস অফ আপিল বলা হত। ২০০৫ সালের সাংবিধানিক সংস্কার আইনের (Constitutional Reform Act 2005) মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর লর্ড সভার এই বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা বিলুপ্ত করা হয়। বর্তমানে এই ধরনের সদস্য নিয়োগ করা হয় না, তবে পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত লর্ডসরা এখনো সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
উপসংহার ব্রিটিশ লর্ড সভার গঠন একাধারে ঐতিহ্যবাহী এবং সংস্কারের ফলাফল। এটি বিভিন্ন ধরনের সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত, যার মধ্যে নির্বাচিত, বংশানুক্রমিক এবং ধর্মীয় প্রতিনিধিরা রয়েছেন। এই বৈচিত্র্য সত্ত্বেও, সভার প্রধান কাজ হলো বিল পর্যালোচনা করা, বিতর্ক করা এবং সরকারের কাজে নজরদারি করা।
ব্রিটিশ লর্ড সভা হলো ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ, যার সদস্যরা মূলত নিয়োগপ্রাপ্ত, বংশানুক্রমিক এবং ধর্মীয় প্রতিনিধি।
আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯৯৯ সালের হাউস অফ লর্ডস অ্যাক্ট (House of Lords Act 1999) একটি ঐতিহাসিক সংস্কার ছিল, যা বেশিরভাগ বংশানুক্রমিক পিয়ারদের সদস্যপদ বাতিল করে। এই আইনের আগে, লর্ড সভার সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৫০, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন বংশানুক্রমিক। ২০২০ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, লর্ড সভার সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৯০ জন। ১৯১১ সালের পার্লামেন্ট অ্যাক্ট লর্ড সভার ভেটো ক্ষমতা সীমিত করে দেয়, যা হাউস অফ কমন্সকে আরও শক্তিশালী করে।

