- readaim.com
- 0
উত্তর।।সূচনা:- সরকার ব্যবস্থা বিশ্বের প্রতিটি দেশের পরিচালনার মূল ভিত্তি। প্রতিটি দেশের সরকার ব্যবস্থা আলাদা। সাধারণত সরকার প্রধান ও শাসন ক্ষমতার বণ্টন নীতি অনুসারে সরকার ব্যবস্থাকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। এই দুটি ব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সুবিধা এবং অসুবিধা রয়েছে, যা একটি দেশের রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে। এই নিবন্ধে আমরা এই দুটি ভিন্ন সরকার ব্যবস্থার মূল পার্থক্যগুলো সহজ ও সরলভাবে আলোচনা করব।
১। ক্ষমতা বিভাজন: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে আইনসভা ও শাসন বিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। এখানে শাসন বিভাগ (প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ) আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে এবং আইনসভার আস্থা হারালে তাদের পদত্যাগ করতে হয়। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে ক্ষমতা কঠোরভাবে বিভাজিত থাকে। শাসন বিভাগ (রাষ্ট্রপতি) আইনসভা থেকে স্বাধীন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হন, তাই তাকে আইনসভার আস্থার ওপর নির্ভর করতে হয় না।
২। সরকার প্রধানের নির্বাচন: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রী আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। জনগণ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ভোট দেয় না, বরং আইনসভার সদস্যদের ভোট দেয়, যারা পরবর্তীতে তাদের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন অথবা নির্বাচকমণ্ডলী দ্বারা নির্বাচিত হন, যা তাকে জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট দেয়।
৩। মন্ত্রিপরিষদের গঠন: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রী তার দলের বা জোটের সদস্যদের মধ্য থেকে মন্ত্রী নির্বাচন করেন, যারা সাধারণত আইনসভার সদস্য হন। মন্ত্রিসভার সদস্যরা সম্মিলিতভাবে আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকেন এবং তাদের সিদ্ধান্তগুলি যৌথভাবে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি তার পছন্দ অনুযায়ী মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন, যারা সাধারণত আইনসভার সদস্য হন না এবং তারা রাষ্ট্রপতির কাছে এককভাবে দায়বদ্ধ থাকেন।
৪। দায়বদ্ধতা: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা তাদের কার্যকলাপের জন্য সরাসরি আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে। আইনসভা অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে, যা সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি আইনসভার কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ নন। তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করা জটিল এবং সাধারণত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহৃত হয়।
৫। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় শাসন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। সরকারই বেশিরভাগ বিল উত্থাপন করে এবং আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা পাস করায়। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে আইনসভা স্বাধীনভাবে আইন প্রণয়ন করে এবং রাষ্ট্রপতির ভেটো ক্ষমতা আইন প্রণয়নে একটি ভারসাম্য বজায় রাখে।
৬। রাজনৈতিক স্থায়িত্ব: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে যদি কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় বা জোট সরকার ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়। অনাস্থা প্রস্তাব বা মধ্যবর্তী নির্বাচন এই ব্যবস্থার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতির নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকায় রাজনৈতিক স্থায়িত্ব বেশি থাকে, তবে আইনসভা ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।
৭। জরুরি অবস্থা মোকাবিলা: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে জরুরি অবস্থার সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কিছুটা কঠিন হতে পারে, কারণ মন্ত্রিপরিষদের সম্মিলিত আলোচনার প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থার সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা অনেক সময় কার্যকর প্রমাণিত হয়।
৮। ক্ষমতার ভারসাম্য: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে আইনসভা ও শাসন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে, যেখানে শাসন বিভাগ আইনসভার তত্ত্বাবধানে থাকে। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতির হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, যা অনেক সময় ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তবে আইনসভার চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স এটি সীমিত করে।
৯। বিরোধী দলের ভূমিকা: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সরকারের কার্যকলাপের সমালোচনা করে এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব করে, যা সরকারকে আরও বেশি জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে বিরোধী দলের ভূমিকা কিছুটা সীমিত হতে পারে, কারণ তারা সরাসরি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে না।
১০। সরকারের পতন: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে আইনসভায় অনাস্থা প্রস্তাব পাস হলে বা বাজেট প্রত্যাখ্যান হলে সরকারের পতন হতে পারে। এটি সরকারকে আইনসভার প্রতি অত্যন্ত সতর্ক থাকতে বাধ্য করে। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতির পতন কেবল অভিশংসন বা পদত্যাগের মাধ্যমেই সম্ভব, যা সাধারণত কঠিন প্রক্রিয়া।
১১। জনগণের অংশগ্রহণ: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সরকারের ওপর প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করে, যা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।
১২। নীতি নির্ধারণ: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে নীতি নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তার মন্ত্রিপরিষদ যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি একাই নীতি নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করেন, যদিও তাকে আইনসভার সমর্থন নিতে হয়।
১৩। চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে আইনসভা সরকারের ওপর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে আইনসভা, বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতি একে অপরের ওপর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স প্রয়োগ করে।
১৪। দলীয় শৃঙ্খলা: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে দলীয় শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারের টিকে থাকার জন্য আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা অপরিহার্য। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে দলীয় শৃঙ্খলা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাষ্ট্রপতির পদ আইনসভার ওপর নির্ভরশীল নয়।
১৫। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও ঐক্যমত্য: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে প্রায়শই আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য জোট গঠন বা ঐক্যমত্যের প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, যদিও আইনসভায় তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে তার কাজ সহজ হয়।
১৬। সঙ্কটকালীন নেতৃত্ব: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে সঙ্কটের সময় প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে নেতৃত্ব দেয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি একাই সঙ্কটকালীন নেতৃত্ব দেন, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।
১৭। নিয়োগ পদ্ধতি: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে মন্ত্রীদের নিয়োগ প্রধানমন্ত্রী করেন এবং তাদের আইনসভার সদস্য হতে হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি তার পছন্দ মতো মন্ত্রী নিয়োগ করেন এবং তারা আইনসভার সদস্য না হলেও চলে।
১৮। ভোটের গুরুত্ব: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে প্রতিটি সংসদীয় আসনের ভোটারের গুরুত্ব বেশি, কারণ তারা সরাসরি তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য প্রতিটি ভোটের গুরুত্ব সরাসরি রাষ্ট্রপতির ওপর পড়ে।
১৯। বিচার বিভাগের ভূমিকা: উভয় প্রকার সরকার ব্যবস্থাতেই বিচার বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তবে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও বেশি সুরক্ষিত থাকে, কারণ এটি সরাসরি আইনসভা বা শাসন বিভাগের ওপর নির্ভরশীল নয়।
২০। প্রথা ও ঐতিহ্য: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে অনেক প্রথা ও ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়, যা অলিখিত সংবিধানের অংশ। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে সংবিধানের লিখিত নিয়মকানুন বেশি অনুসরণ করা হয়।
২১। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি একাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেন।
উপসংহার: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার উভয় ব্যবস্থারই নিজস্ব সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। একটি দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে কোন ব্যবস্থাটি সবচেয়ে উপযুক্ত, তা নির্ধারণ করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার জবাবদিহিতা এবং আইনসভার ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেয়, যেখানে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার স্থায়িত্ব এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের ওপর জোর দেয়। দুটি ব্যবস্থার মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ তা বলা মুশকিল, কারণ প্রতিটি ব্যবস্থারই নিজস্ব উপযোগিতা রয়েছে এবং এটি নির্ভর করে একটি দেশ কোন ধরনের শাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায় তার ওপর।
- ১। ক্ষমতা বিভাজন
- ২। সরকার প্রধানের নির্বাচন
- ৩। মন্ত্রিপরিষদের গঠন
- ৪। দায়বদ্ধতা
- ৫। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া
- ৬। রাজনৈতিক স্থায়িত্ব
- ৭। জরুরি অবস্থা মোকাবিলা
- ৮। ক্ষমতার ভারসাম্য
- ৯। বিরোধী দলের ভূমিকা
- ১০। সরকারের পতন
- ১১। জনগণের অংশগ্রহণ
- ১২। নীতি নির্ধারণ
- ১৩। চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স
- ১৪। দলীয় শৃঙ্খলা
- ১৫। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও ঐক্যমত্য
- ১৬। সঙ্কটকালীন নেতৃত্ব
- ১৭। নিয়োগ পদ্ধতি
- ১৮। ভোটের গুরুত্ব
- ১৯। বিচার বিভাগের ভূমিকা
- ২০। প্রথা ও ঐতিহ্য
- ২১। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা, যা ওয়েস্টমিনিস্টার মডেল নামেও পরিচিত, এর উৎপত্তি হয়েছিল ১৭শ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে। ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লবের পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং প্রধানমন্ত্রী পদ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যা ১৭৮৭ সালের সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ফরাসি পঞ্চম প্রজাতন্ত্র (১৯৫৮) একটি মিশ্র বা অর্ধ-রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার উদাহরণ। ২০১৯ সালের একটি জরিপ অনুসারে, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক দেশ মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার অনুসরণ করে, যেখানে প্রায় ৪০% দেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত বা মিশ্র ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। কিছু দেশ, যেমন জার্মানি (১৯৪৯) এবং ভারত (১৯৫০), মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার গ্রহণ করেছে, যেখানে ব্রাজিল (১৮৮৯) এবং দক্ষিণ কোরিয়া (১৯৪৮) রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার পথ বেছে নিয়েছে।

