- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মরিস দ্যুভারজার রাজনৈতিক দলের সংগঠন, সদস্যভিত্তি, নেতৃত্ব, উৎপত্তি ও দলীয় ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব প্রদান করেন। তাঁর পার্টিতত্ত্ব আধুনিক রাজনৈতিক দলের কাঠামো ও কার্যপ্রণালি বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মরিস দ্যুভারজারের পার্টিতত্ত্ব আলোচনা:
১। দলীয় সংগঠন: দ্যুভারজারের মতে, রাজনৈতিক দলকে বুঝতে হলে শুধু তার আদর্শ নয়, সংগঠন কাঠামোও বিশ্লেষণ করতে হয়। সদস্য, নেতৃত্ব, স্থানীয় শাখা, কেন্দ্রীয় কমিটি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি একটি দলের প্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২। ক্যাডার দল: দ্যুভারজার রাজনৈতিক দলের একটি প্রধান ধরন হিসেবে ক্যাডার পার্টির কথা বলেন। এ ধরনের দলে সদস্যসংখ্যার চেয়ে প্রভাবশালী, দক্ষ ও অর্থবান ব্যক্তিদের গুরুত্ব বেশি। নির্বাচনী সময় তাদের সংগঠন, অর্থ ও সামাজিক প্রভাব দলকে রাজনৈতিক সাফল্য অর্জনে সহায়তা করে।
৩। গণদল: গণদল বা Mass Party ব্যাপক সদস্যভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন। সাধারণ মানুষ নিয়মিত সদস্যপদ গ্রহণ, চাঁদা প্রদান ও দলীয় কার্যক্রমে অংশ নেয়। শ্রমিক, কৃষক বা সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে বৃহৎ সামাজিক ভিত্তি গড়ে তোলাই এ ধরনের দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৪। সদস্যের গুরুত্ব: ক্যাডার দলে সাধারণ সদস্যের তুলনায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব বেশি হলেও গণদলে সদস্যই প্রধান শক্তি। দ্যুভারজারের মতে, সদস্যসংখ্যা, সদস্যের সক্রিয়তা ও সংগঠনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে রাজনৈতিক দলের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
৫। অভ্যন্তরীণ সৃষ্টি: দ্যুভারজার রাজনৈতিক দলের উৎপত্তির একটি ধরন হিসেবে সংসদের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা দলের কথা বলেন। সংসদ সদস্য বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে দল সৃষ্টি করে। পরে সেই দল জনসমর্থন বাড়াতে সংসদের বাইরেও সংগঠন বিস্তার করে।
৬। বাহ্যিক সৃষ্টি: কিছু রাজনৈতিক দল সংসদের বাইরে সামাজিক আন্দোলন, শ্রমিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে সৃষ্টি হয়। দ্যুভারজারের মতে, এ ধরনের দল সাধারণত বেশি সংগঠিত, আদর্শনির্ভর ও সদস্যকেন্দ্রিক হয়ে থাকে এবং পরে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেয়।
৭। প্রাথমিক সংগঠন: দ্যুভারজার রাজনৈতিক দলের মৌলিক সংগঠন হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ছোট ইউনিটের কথা বলেন। শাখা, সেল, কমিটি ও মিলিশিয়ার মতো কাঠামো দলের সদস্যদের সংগঠিত করে। এসব ইউনিটের প্রকৃতি অনুযায়ী দলের নেতৃত্ব, সদস্যসম্পর্ক ও কার্যক্রমের ধরন পরিবর্তিত হয়।
৮। শাখা ব্যবস্থা: গণদলে স্থানীয় শাখা গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভিত্তি। এসব শাখার মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ, রাজনৈতিক শিক্ষা, জনসংযোগ ও দলীয় কর্মসূচি পরিচালিত হয়। স্থানীয় শাখা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সাধারণ সদস্যের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং দলকে ব্যাপক সামাজিক ভিত্তি প্রদান করে।
৯। সেল ব্যবস্থা: বিশেষত বিপ্লবী বা কমিউনিস্ট দলগুলোতে সেলভিত্তিক সংগঠন দেখা যায়। ছোট কর্মক্ষেত্র বা এলাকার ভিত্তিতে গঠিত সেল সদস্যদের ঘনিষ্ঠভাবে সংগঠিত রাখে। এর ফলে দলীয় শৃঙ্খলা, আদর্শিক শিক্ষা ও কেন্দ্রীয় নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
১০। নেতৃত্বের প্রভাব: দ্যুভারজার দেখান, রাজনৈতিক দলে নেতৃত্বের ধরন সংগঠনের চরিত্র নির্ধারণ করে। কিছু দলে নেতৃত্ব তুলনামূলক বিকেন্দ্রীভূত, আবার কিছু দলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী। ক্ষমতার এই বিন্যাস দলের গণতান্ত্রিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
১১। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র: রাজনৈতিক দলের ভেতরে সদস্যদের মতামত, নেতৃত্ব নির্বাচন ও নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। দ্যুভারজারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো দল বাহ্যিকভাবে গণতান্ত্রিক হলেও তার অভ্যন্তরে শক্তিশালী নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে। তাই দলীয় গণতন্ত্র সবসময় সমান নয়।
১২। দলীয় শৃঙ্খলা: রাজনৈতিক দলের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সংগঠনগত শৃঙ্খলা প্রয়োজন। বিশেষত গণদল ও আদর্শভিত্তিক দলে সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে হয়। শক্তিশালী শৃঙ্খলা দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখলেও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত করতে পারে।
১৩। একদলীয় ব্যবস্থা: দ্যুভারজার দলীয় ব্যবস্থার একটি ধরন হিসেবে একদলীয় ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। এখানে একটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রধান বা একচেটিয়া অবস্থান ধরে রাখে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমিত থাকায় সিদ্ধান্ত দ্রুত হতে পারে, কিন্তু বহুমত ও বিরোধী রাজনীতির সুযোগ কম থাকে।
১৪। দ্বিদলীয় ব্যবস্থা: দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় দুটি প্রধান দল রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ছোট দল থাকলেও সরকার গঠনে মূল প্রতিযোগিতা দুই দলের মধ্যে সীমিত থাকে। দ্যুভারজারের মতে, একক-সদস্য নির্বাচনী এলাকা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটপদ্ধতি দ্বিদলীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক।
১৫। বহুদলীয় ব্যবস্থা: বহুদলীয় ব্যবস্থায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। বিভিন্ন মত, শ্রেণি ও গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বেশি হলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে জোট সরকার, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং কখনো কখনো সরকার পরিবর্তনের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
১৬। দ্যুভারজারের সূত্র: দ্যুভারজারের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো নির্বাচনী ব্যবস্থা দলীয় ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। সাধারণত একক-সদস্য আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটপদ্ধতি দ্বিদলীয় ব্যবস্থা উৎসাহিত করে, আর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি বহুদলীয় ব্যবস্থার বিকাশে সহায়ক হয়। এ সম্পর্কই ‘Duverger’s Law’ নামে পরিচিত।
১৭। সামগ্রিক মূল্যায়ন: দ্যুভারজারের পার্টিতত্ত্ব রাজনৈতিক দলকে সংগঠন, সদস্যভিত্তি, উৎপত্তি ও দলীয় ব্যবস্থার আলোকে বিশ্লেষণ করে। ক্যাডার ও গণদলের বিভাজন এবং নির্বাচন পদ্ধতির সঙ্গে দলীয় ব্যবস্থার সম্পর্ক তাঁর তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ অবদান, যা আজও তুলনামূলক রাজনীতিতে বহুল আলোচিত।
উপসংহার: মরিস দ্যুভারজারের পার্টিতত্ত্ব আধুনিক রাজনৈতিক দল বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ক্যাডার ও গণদলের পার্থক্য, দলের উৎপত্তি, সাংগঠনিক কাঠামো এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সঙ্গে দলীয় ব্যবস্থার সম্পর্ক তাঁর তত্ত্বকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। রাজনৈতিক দলের বাস্তব চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রে এ তত্ত্ব আজও প্রাসঙ্গিক।