- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রস্তাবনা: ১৪ শতকের বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাবিদ প্যাদুয়ার মার্সিলিও (Marsilio of Padua) মধ্যযুগের ইউরোপে প্রচলিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ধারণার বিরুদ্ধে এক বিপ্লবী তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তার প্রধান গ্রন্থ Defensor Pacis-এ তিনি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এবং চার্চ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। তার আইন তত্ত্ব আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার একটি ভিত্তি স্থাপন করে।
মার্সিলিওর আইন তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো, আইনের উৎস কোনো ঐশ্বরিক বা প্রাকৃতিক শক্তি নয়, বরং জনগণের সমষ্টিগত ইচ্ছা। তিনি মনে করতেন, একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতেই ন্যস্ত। এই ধারণাকে তিনি Voluntas Generalis বা সাধারণ ইচ্ছা হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, আইন হলো সেই নিয়ম, যা জনগণের দ্বারা বা জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত হয় এবং সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে।
মার্সিলিও তার তত্ত্বে আইনের চারটি স্তর চিহ্নিত করেন:
- ঐশ্বরিক আইন (Divine Law): এটি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে প্রদত্ত আইন, যা পরকালে পুরস্কার বা শাস্তির সাথে সম্পর্কিত। এই আইন পার্থিব জীবনে প্রয়োগের জন্য নয়।
- প্রাকৃতিক আইন (Natural Law): এটি হলো সেই আইন যা প্রকৃতি বা যুক্তির দ্বারা নির্ধারিত হয়। মার্সিলিও মনে করতেন, এটি মানুষের নৈতিকতার ভিত্তি, কিন্তু এটি রাষ্ট্রীয় আইন নয়।
- মানবিক আইন (Human Law): এটি হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা বা সার্বভৌম জনগণের দ্বারা প্রণীত আইন। এটিই আসল আইন এবং এর লঙ্ঘনের জন্য পার্থিব শাস্তি রয়েছে। মার্সিলিওর মতে, এটিই একমাত্র কার্যকর আইন।
- রাষ্ট্রীয় আইন (Positive Law): এটি মানবিক আইনেরই একটি অংশ, যা নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও শাস্তির বিধান করে।
মার্সিলিও জোর দিয়ে বলেন যে, আইন প্রণয়নের সার্বভৌম ক্ষমতা শুধুমাত্র জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের (Legislator Humanus) হাতে থাকবে। কোনো রাজা বা ধর্মীয় নেতা এককভাবে এই ক্ষমতা ভোগ করতে পারবেন না। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি পোপ এবং চার্চের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং রাষ্ট্রকে ধর্মীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করার আহ্বান জানান। তার এই ধারণা পরবর্তীতে জন লক এবং জ্যাঁ-জ্যাক রুসোর মতো দার্শনিকদের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে।
উপসংহার: মার্সিলিওর আইন তত্ত্ব ছিল মধ্যযুগের একটি সাহসী এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারা। তিনি প্রথমবার রাষ্ট্রকে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে দেখেন এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রভাবের বদলে জনগণের সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠা করেন। তার এই ধারণা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ, অর্থাৎ জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে সরকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেয়।
মার্সিলিওর আইন তত্ত্ব হলো জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার মাধ্যমে আইন প্রণয়নের ধারণা।
মার্সিলিও (১২৭০-১৩৪২) তার Defensor Pacis বইটি ১৩২৪ সালে রচনা করেন, যা ছিল পোপ এবং পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একটি উত্তপ্ত সময়ের ফল। এই গ্রন্থে তিনি চার্চকে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসার কথা বলেন, যা পরবর্তীতে প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনের সময় মার্টিন লুথারের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছিল।

