- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মৌলিক গণতন্ত্র, যা আইয়ুব খানের শাসনামলে প্রবর্তিত হয়েছিল, ছিল একটি বিশেষ ধরনের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। এটি এমন একটি ধারণা যা গণতন্ত্রের নামে হলেও, প্রকৃতপক্ষে সামরিক শাসনের অধীনে সীমিত পরিসরে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি জনগণের আনুগত্য নিশ্চিত করার একটি কৌশল ছিল। এটি প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়ে ভিন্ন ছিল এবং এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শাসককে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা, যদিও এর সীমাবদ্ধতা ছিল অনেক।
শাব্দিক অর্থ
মৌলিক গণতন্ত্রের শাব্দিক অর্থ হলো ‘প্রাথমিক বা ভিত্তিগত গণতন্ত্র’। এখানে ‘মৌলিক’ বলতে একদম তৃণমূল পর্যায়কে বোঝানো হয়েছে, যেখানে সরাসরি জনগণের একটি সীমিত অংশের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল।
মৌলিক গণতন্ত্রের পরিচয়:
মৌলিক গণতন্ত্র বলতে একটি পরোক্ষ নির্বাচনভিত্তিক শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়, যা ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থায় দেশের সকল ভোটার সরাসরি কেন্দ্রে প্রতিনিধি নির্বাচন না করে, গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচিত প্রায় ৮০ হাজার (পরে ১ লক্ষ ২০ হাজার) ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’ তৈরি করা হয়। এই মৌলিক গণতন্ত্রীরাই পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নির্বাচিত করতেন। এটি ছিল গণতন্ত্রের একটি নিয়ন্ত্রিত রূপ, যেখানে সামরিক শাসনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
সাধারণ ভাষায়, মৌলিক গণতন্ত্র বলতে আমরা বুঝি এমন একটি ভোট ব্যবস্থা যেখানে সবাই সরাসরি ভোট দিয়ে বড় নেতা নির্বাচন করতে পারে না। বরং, প্রথমে কিছু ছোট নেতাকে (মৌলিক গণতন্ত্রী) ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা হয়, আর তারাই পরে বড় নেতা বা রাষ্ট্রপতিকে ভোট দেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোটের ক্ষমতা কমে যায় এবং সরকারে কে আসবে, তা পুরোপুরি জনগণের হাতে থাকে না। এটা সামরিক শাসনের সময়ে চালু হয়েছিল যাতে শাসকরা সহজেই নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
১। “মৌলিক গণতন্ত্র ছিল আইয়ুব খানের একটি রাজনৈতিক কৌশল, যা স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত গণতন্ত্রের মাধ্যমে সামরিক শাসনকে বৈধতা দিতে চেয়েছিল।” (Basic Democracy was a political strategy of Ayub Khan, which aimed to legitimize military rule through limited democracy at the local level.)
২। “এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে গণভোটের পরিবর্তে একটি নির্বাচিত প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে পরোক্ষ নির্বাচন পরিচালিত হয়, যা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের চেয়ে কেন্দ্রীকরণকে বেশি উৎসাহিত করে।” (It is a system where indirect elections are conducted through an electoral college rather than through universal suffrage, which encourages centralization rather than decentralization of power.)
৩। “মৌলিক গণতন্ত্র হলো একটি নিয়ন্ত্রিত বা নির্দেশিত গণতন্ত্রের উদাহরণ, যা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রোধ এবং সামরিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল।” (Basic Democracy is an example of controlled or guided democracy, designed to prevent political instability and maintain military authority.)
৪। “মৌলিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি জনগণের আনুগত্য তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যেখানে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল না।” (Basic Democracy attempted to create public loyalty towards the central government by utilizing local government institutions, without direct public participation.)
৫। “এটি একটি অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা যা সামরিক শাসকের ব্যক্তিগত ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যদিও একে ‘গণতন্ত্র’ বলে অভিহিত করা হয়।” (It is an undemocratic system of governance designed to consolidate the personal power of the military ruler, despite being termed ‘democracy’.)
৬। “মৌলিক গণতন্ত্র ছিল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার একটি সীমিত প্রচেষ্টা, যা মূলত দেশের রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক শাসনের ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছিল।” (Basic Democracy was a limited attempt to establish local self-governance, primarily aimed at controlling the country’s political forces and strengthening the base of military rule.)
৭। “মৌলিক গণতন্ত্র মূলত একটি ‘উপকৌশল’ ছিল, যার মাধ্যমে জনগণের সীমিত অংশগ্রহণের সুযোগ রেখে সামরিক শাসকরা তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল।” (Basic Democracy was primarily a ‘tactic’ through which military rulers sought to prolong their power by allowing limited public participation.)
উপরের সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা এই বিষয়টিকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি:-
মৌলিক গণতন্ত্র বলতে সামরিক শাসক আইয়ুব খান কর্তৃক প্রবর্তিত একটি পরোক্ষ, নিয়ন্ত্রিত এবং চার স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে সীমিত সংখ্যক নির্বাচিত মৌলিক গণতন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতি এবং উচ্চ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচন করতেন। এই ব্যবস্থাটি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারকে খর্ব করে সামরিক শাসনের বৈধতা প্রদান এবং ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার একটি কৌশল ছিল।
পরিসমাপ্তি: মৌলিক গণতন্ত্র, যদিও নামমাত্র ‘গণতন্ত্র’ ছিল, তবে এটি প্রকৃত অর্থে জনগণের অংশগ্রহণমূলক বা প্রতিনিধিত্বমূলক ছিল না। এর উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শাসনকে দীর্ঘায়িত করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা। এই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় কারণ এটি জনগণের স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি পূরণ করতে পারেনি। মৌলিক গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রমাণ করে যে, প্রকৃত গণতন্ত্রই একটি জাতির অগ্রগতির একমাত্র পথ।
মৌলিক গণতন্ত্র হলো আইয়ুব খান প্রবর্তিত পরোক্ষ নির্বাচনভিত্তিক একটি সীমিত শাসনব্যবস্থা।
মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা ১৯৫৯ সালে (অক্টোবর) পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থার অধীনে ৮০,০০০ মৌলিক গণতন্ত্রী (৪০,০০০ পূর্ব পাকিস্তান থেকে এবং ৪০,০০০ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে) নির্বাচিত হন, যাদের দায়িত্ব ছিল স্থানীয় সমস্যা সমাধান করা এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি ও আইনসভা নির্বাচন করা। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্রী সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান হয়, যার ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এটি ছিল বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

