- readaim.com
- 0
উত্তর::সূচনা: যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা হলো এমন এক ধরনের সরকার কাঠামো, যেখানে ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় সরকার এবং কিছু আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিভক্ত থাকে। এই ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে প্রতিটি স্তরের সরকার নিজ নিজ অধিকার ও দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে। এটি একটি জটিল রাজনৈতিক ধারণা, যা রাষ্ট্র পরিচালনা ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শাব্দিক অর্থ:- ইংরেজি “Federalism” শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ “Foedus” থেকে, যার অর্থ “চুক্তি” বা “ঐক্য”। এই শাব্দিক অর্থ থেকে বোঝা যায় যে, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মধ্যে একটি চুক্তি বা সমঝোতার মাধ্যমে এই ধরনের শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা হলো এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে শাসন ক্ষমতা সংবিধান দ্বারা কেন্দ্রীয় সরকার এবং একাধিক আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এই দুই স্তরের সরকারই নিজ নিজ নির্দিষ্ট পরিধিতে স্বাধীনভাবে কাজ করে। এই ব্যবস্থায় উভয় সরকারের ক্ষমতা এবং কার্যপরিধি সুনির্দিষ্টভাবে সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকে, যাতে কোনো পক্ষই একে অপরের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশে এই ধরনের শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান।
অনেক গবেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিচে তাদের মধ্যে কয়েকজনের গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা দেওয়া হলো:
১। অ্যারিস্টটল (Aristotle): “যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা হলো একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে একাধিক স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র একটি সাধারণ সরকারের অধীনে একত্রিত হয়।”
২। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski): “ফেডারেলিজম বলতে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে ক্ষমতার বিভাজন এমনভাবে করা হয় যে স্থানীয় সরকারগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ নয়, বরং তারা নিজস্ব ক্ষেত্রে স্বাধীন।”
৩। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): “একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় সরকারের বদলে একাধিক সহযোগী সত্তার মধ্যে ন্যস্ত থাকে।”
৪। সি. এফ. স্ট্রং (C.F. Strong): “যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা হলো এমন এক ধরনের সংবিধান, যেখানে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতার এমনভাবে বিভাজন করা হয় যে উভয়ই নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীন।”
৫। জেমস ম্যাডিসন (James Madison): তিনি ফেডারেলিস্ট পেপারস-এ উল্লেখ করেছেন, “ফেডারেলিজম হলো বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে একটি চুক্তি, যেখানে প্রত্যেকেই তার নিজস্ব সার্বভৌমত্ব বজায় রাখে।
৬। কার্ল মার্কস (Karl Marx): “যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হলো এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যা বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থে ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীভূত করে।”
৭। টমাস হবস (Thomas Hobbes): তিনি ফেডারেলিজমকে একটি “কমনওয়েলথ” হিসাবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে আইন দ্বারা শাসিত একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায় সাধারণ মঙ্গলের জন্য গঠিত হয়।”
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি: এটি এমন একটি সরকার ব্যবস্থা, যেখানে একাধিক স্বায়ত্তশাসিত ইউনিট (যেমন: রাজ্য বা প্রদেশ) একটি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তির ভিত্তিতে যুক্ত হয়। এই ব্যবস্থায় ক্ষমতা সংবিধানের মাধ্যমে উভয় স্তরের সরকারের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে বন্টন করা হয়, যাতে কোনো পক্ষই এককভাবে সর্বেসর্বা না হতে পারে।
উপসংহার: যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা একটি দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা, বৈচিত্র্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত হতে বাধা দেয় এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক সরকারগুলোকে স্বাধীনতা প্রদান করে। একই সঙ্গে, এটি জাতীয় ঐক্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারেরও ব্যবস্থা করে। তাই বলা যায়, এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে, যা একটি আধুনিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা হলো এমন একটি সরকার কাঠামো যেখানে শাসন ক্ষমতা সংবিধানের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় এবং আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে বন্টিত হয়।
ঐতিহাসিকভাবে, ১৭৮৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মাধ্যমে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে, এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর দেশটি একটি সফল ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০% মানুষ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার অধীনে বসবাস করে। ২০০৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ ফেডারেলিজম-এর এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় ২৭টি দেশে এই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।

