- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তার রচিত “সামাজিক চুক্তি” (The Social Contract) নামক গ্রন্থটি রাজনৈতিক দর্শনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্র ও সমাজের উৎপত্তি, স্বাধীনতা ও কর্তৃত্বের সম্পর্ক এবং সরকার গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার এই মতবাদ ফরাসি বিপ্লবসহ পৃথিবীর অনেক রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করেছে। রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদটি হলো একটি তাত্ত্বিক কাঠামো, যেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে কীভাবে মানুষেরা নিজেদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্য একটি সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র গঠন করে।
রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদটি হল এমন একটি ধারণা যেখানে বলা হয়েছে যে, মানুষেরা প্রাকৃতিক অবস্থার অরাজকতা ও অনিরাপত্তা থেকে মুক্তি পেতে নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও অধিকার একটি সাধারণ সত্তার কাছে সমর্পণ করে, যাকে তিনি ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (General Will) হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই সাধারণ ইচ্ছাই হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। এই মতবাদের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব স্বাধীনতা ও অধিকার বজায় রাখতে পারবে, একই সাথে একটি সংঘবদ্ধ সমাজের অংশ হিসেবে সুরক্ষা লাভ করবে। রুশো বিশ্বাস করতেন যে, এই চুক্তি কেবল একবারের জন্য নয়, বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজ তার নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা বজায় রাখে।
১। প্রাকৃতিক অবস্থা: রুশোর মতে, মানুষ প্রথমে প্রকৃতির মাঝে শান্ত ও সরল জীবনযাপন করত, যা ছিল এক ধরনের ‘স্বর্ণযুগ’। এই অবস্থায় মানুষ স্বাধীন ছিল এবং তাদের মধ্যে কোনো প্রকারের হিংসা, লোভ বা দ্বন্দ্ব ছিল না। মানুষ ছিল স্বনির্ভর এবং অন্যের উপর নির্ভরশীল ছিল না। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে সম্পদ নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যার ফলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটে। এই ব্যক্তিগত সম্পত্তিই সমাজে অসমতা এবং দ্বন্দ্বের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের এই শান্ত ও প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি চুক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, কারণ এই অবস্থা আর মানুষের জন্য নিরাপদ ছিল না।
২। স্বাধীনতার সুরক্ষা: রুশো তার সামাজিক চুক্তি মতবাদে স্বাধীনতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতাকে রক্ষা করা। মানুষ যখন চুক্তিতে প্রবেশ করে, তখন তারা তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা ‘ব্যক্তিগত ইচ্ছা’ (Particular Will) ত্যাগ করে, কিন্তু বিনিময়ে একটি নতুন ধরনের স্বাধীনতা লাভ করে, যা ‘সামাজিক স্বাধীনতা’ (Civil Liberty)। এই স্বাধীনতা সাধারণ ইচ্ছার মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এটি ব্যক্তির প্রকৃত স্বাধীনতার প্রতিফলন। এর মাধ্যমে ব্যক্তি একইসাথে সমাজের সদস্য এবং নিজের স্বাধীন সত্তাও বজায় রাখতে পারে, কারণ সে নিজেই সেই আইনের স্রষ্টা যা তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
৩। সামাজিক চুক্তি: রুশোর সামাজিক চুক্তি হল এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি তার সমস্ত অধিকার ও ক্ষমতা সমাজের কাছে সমর্পণ করে। এই সমর্পণ এমনভাবে ঘটে যে, প্রত্যেক ব্যক্তি সবার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, কিন্তু একই সাথে সে নিজেকে নিজের কাছেই সমর্পণ করে। এর ফলে কেউ কারো উপর কোনো বিশেষ সুবিধা পায় না, এবং সবাই সমান হয়ে যায়। এই চুক্তি হলো সমাজের ভিত্তি, যা মানুষের মধ্যে নৈতিক ও রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করে। এই চুক্তির ফলে প্রত্যেকেই তার সমর্পণকৃত অধিকারের বদলে সমাজের কাছ থেকে সুরক্ষা ও সমান অধিকার ফিরে পায়। এটি কোনো নির্দিষ্ট শাসকের সাথে জনগণের চুক্তি নয়, বরং এটি জনগণের নিজেদের মধ্যেকার একটি চুক্তি।
৪। সার্বভৌমত্ব জনগণের: রুশোর মতে, সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো রাজা বা নির্দিষ্ট শাসকের হাতে থাকে না, বরং তা থাকে জনগণের হাতে। জনগণ হলো সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র উৎস। এই সার্বভৌম ক্ষমতাকে তিনি ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বলে অভিহিত করেছেন। এই সাধারণ ইচ্ছা সবসময় সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের দিকে পরিচালিত হয় এবং এটি কখনোই ভুল হতে পারে না। শাসক বা সরকার কেবল এই সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। যদি সরকার সাধারণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করে, তাহলে জনগণ সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। এই ধারণাটি আধুনিক গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, যেখানে জনগণের সম্মতিই শাসনের বৈধতার মূল ভিত্তি।
৫। সাধারণ ইচ্ছা: রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (General Will)। এটি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা নয়, বরং সমাজের সকল সদস্যের সামগ্রিক কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রতিফলন। এটি সমাজের নৈতিক ইচ্ছা, যা সবসময় সঠিক এবং ন্যায়সঙ্গত হয়। সাধারণ ইচ্ছা ব্যক্তিবিশেষের সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকে এবং এটি সমাজের সকলের জন্য সমানভাবে কল্যাণকর। রুশো বলেন, সাধারণ ইচ্ছা সব মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছার সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র নৈতিক সত্তা যা সমাজের সকল সদস্যের সম্মিলিত চেতনা থেকে উদ্ভূত হয়। যখন কোনো ব্যক্তি সাধারণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তখন তাকে জোর করে সাধারণ ইচ্ছার অধীন করা হয়, যা রুশোর মতে তাকে ‘স্বাধীন হতে বাধ্য করা’ (forced to be free)।
৬। সরকার সাধারণ ইচ্ছার প্রতিনিধি: রুশোর মতে, সরকার হলো জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার একটি প্রতিনিধি। সরকার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী নয়, বরং এটি কেবল জনগণের দ্বারা সৃষ্ট একটি যন্ত্র, যা সাধারণ ইচ্ছাকে কার্যকর করার জন্য কাজ করে। সরকার গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো আইন প্রয়োগ করা এবং সমাজের নিয়ম-কানুন পরিচালনা করা। জনগণ যখন খুশি তখন সরকারকে পরিবর্তন করতে পারে। সরকার যদি জনগণের সাধারণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করে, তাহলে তার বৈধতা থাকে না এবং জনগণ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার রাখে। রুশোর এই ধারণাটি আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি তৈরি করেছে, যেখানে সরকার জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে।
৭। নাগরিক ও সাধারণ মানুষ: রুশো তার মতবাদে ‘নাগরিক’ এবং ‘সাধারণ মানুষ’ এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। একজন সাধারণ মানুষ হলো সে যে শুধু তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, একজন নাগরিক হলো সে যে তার ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে। নাগরিকরা সাধারণ ইচ্ছার অংশীদার এবং এর মাধ্যমে তারা সমাজে নিজেদের অধিকার ও কর্তব্য উভয়ই পালন করে। রুশো মনে করতেন, একটি সফল সামাজিক চুক্তির জন্য সমাজের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে নাগরিক চেতনা থাকা আবশ্যক, যাতে তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে সমাজের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।
৮। নৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা: রুশো সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাকে ‘নৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা’ বলেছেন। তিনি মনে করেন, মানুষ যখন প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে সামাজিক অবস্থায় প্রবেশ করে, তখন সে কেবল প্রাকৃতিক ইচ্ছা দ্বারা পরিচালিত হওয়া থেকে মুক্ত হয় এবং বিবেক ও নৈতিকতা দ্বারা পরিচালিত হতে শেখে। এই স্বাধীনতা ব্যক্তিকে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শেখায় এবং তাকে অন্যের দাসত্ব থেকে রক্ষা করে। এটি কোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা নয়, বরং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি স্বাধীনতা, যা সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন। এর মাধ্যমে ব্যক্তি একইসাথে স্বাধীন এবং সমাজের একজন দায়িত্বশীল সদস্য হয়ে ওঠে।
৯। আইনের শাসন: রুশোর মতে, একটি আদর্শ সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। আইন হলো সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন এবং এটি সমাজের সকল সদস্যের উপর সমানভাবে প্রযোজ্য। আইন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় না, বরং এটি সমাজের সকলের সম্মিলিত মঙ্গলের জন্য তৈরি হয়। রুশো বিশ্বাস করতেন, যেখানে আইনের শাসন থাকে সেখানে জনগণের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে, কারণ আইন সবার জন্য সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এই আইনের মাধ্যমেই নাগরিকরা তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয় এবং সমাজে শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের সমালোচনা:-
১। অবাস্তব ধারণা: রুশোর ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’ এবং ‘আদিম মানুষ’ সম্পর্কে ধারণাটি অনেক সমালোচকের কাছে অবাস্তব মনে হয়েছে। ইতিহাস বা নৃতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এমন কোনো স্বর্ণযুগের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, আদিম সমাজেও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব, হিংসা এবং সম্পত্তির ধারণা ছিল। রুশো তার এই ধারণার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ দিতে পারেননি, যার কারণে এটি কেবল একটি কাল্পনিক ধারণা হিসেবে বিবেচিত হয়। তার এই ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় সমগ্র তত্ত্বটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
২। ব্যক্তি স্বাধীনতার বিলুপ্তি: অনেক সমালোচক মনে করেন যে, রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদে ব্যক্তি স্বাধীনতার বিলুপ্তি ঘটে। যখন ব্যক্তি তার সমস্ত অধিকার সমাজের হাতে তুলে দেয়, তখন তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা পছন্দ বলে কিছু থাকে না। ‘সাধারণ ইচ্ছা’র নামে ব্যক্তিকে এমন কিছু করতে বাধ্য করা হয় যা সে নিজে চায় না। রুশোর ‘স্বাধীন হতে বাধ্য করা’ ধারণাটি এক ধরনের স্বৈরাচারী মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়, যা ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও ইচ্ছাকে দমন করে। এর ফলে ব্যক্তি তার নিজস্ব সত্তা হারিয়ে সমাজের একটি যন্ত্রে পরিণত হয়।
৩। ‘সাধারণ ইচ্ছা’র অস্পষ্টতা: রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’র ধারণাটি খুবই অস্পষ্ট এবং ব্যাখ্যা করা কঠিন। তিনি এটি ঠিক কী এবং কীভাবে এটি গঠিত হয়, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা দেননি। বাস্তব জীবনে ‘সাধারণ ইচ্ছা’কে কীভাবে চিহ্নিত করা যাবে, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাকেই ‘সাধারণ ইচ্ছা’ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, যা সংখ্যালঘুদের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। এর ফলে এক ধরনের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।
৪। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের অবাস্তবতা: রুশো প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন, যেখানে জনগণ সরাসরি আইন প্রণয়নে অংশ নেবে। কিন্তু আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ অবাস্তব। বিশাল জনসংখ্যার কারণে প্রতিটি নাগরিকের পক্ষে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। এর ফলে তার মতবাদটি ছোট নগর রাষ্ট্রগুলোর জন্য হয়তো প্রযোজ্য, কিন্তু আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রের জন্য নয়। এটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে।
৫। স্বৈরাচারী শাসনের ভিত্তি: রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’র ধারণাটিকে অনেক সময় স্বৈরাচারী শাসনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। হিটলার ও মুসোলিনির মতো স্বৈরশাসকরা জনগণের ইচ্ছার নামে তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকেই সমাজের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। যেহেতু ‘সাধারণ ইচ্ছা’কে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ নেই, তাই শাসক সহজেই এর আড়ালে নিজেদের ক্ষমতাকে সুসংহত করতে পারে। এই মতবাদটি একদলীয় শাসন বা সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে ভিন্নমত বা বিরোধী কণ্ঠস্বরকে সহজেই দমন করা হয়।
উপসংহার: রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদটি রাজনৈতিক দর্শনে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। তার এই ধারণা আধুনিক গণতন্ত্র, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কোনো ঐশ্বরিক বা বংশগত অধিকারের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি জনগণের সম্মতি ও ইচ্ছার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদিও তার মতবাদের কিছু দিক (যেমন – ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’) সমালোচিত হয়েছে, তবুও তার মূল বার্তাটি আজও প্রাসঙ্গিক। রুশো আমাদের শিখিয়েছেন যে, একটি ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ এবং তাদের অধিকারের প্রতি সম্মান অপরিহার্য। তার এই দর্শন আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরিতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছে।
- ১। 🌍 প্রাকৃতিক অবস্থা: মানুষ প্রকৃতির মাঝে শান্ত ও স্বাধীন জীবনযাপন করত, যা ছিল এক ধরনের স্বর্ণযুগ। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব এই শান্ত অবস্থাকে নষ্ট করে দেয়।
- ২। 🕊️ স্বাধীনতার সুরক্ষা: চুক্তির মাধ্যমে মানুষ তাদের প্রাকৃতিক স্বাধীনতা হারিয়ে সামাজিক স্বাধীনতা লাভ করে, যা তাদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
- ৩। 🤝 সামাজিক চুক্তি: জনগণ নিজেদের সমস্ত অধিকার ও ক্ষমতা একটি চুক্তির মাধ্যমে সমাজের কাছে সমর্পণ করে, যার ফলে তারা সমান অধিকার ও সুরক্ষা ফিরে পায়।
- ৪। 👑 সার্বভৌমত্ব জনগণের: সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো রাজা বা শাসকের হাতে নয়, বরং তা জনগণের হাতে থাকে, যাকে তিনি ‘সাধারণ ইচ্ছা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
- ৫। 📢 সাধারণ ইচ্ছা: এটি সমাজের সকল সদস্যের সামগ্রিক কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রতিফলন, যা সবসময় ন্যায়সঙ্গত এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
- ৬। 🏛️ সরকার সাধারণ ইচ্ছার প্রতিনিধি: সরকার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী নয়, বরং এটি জনগণের ইচ্ছাকে কার্যকর করার জন্য গঠিত একটি প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে।
- ৭। 🧑🤝🧑 নাগরিক ও সাধারণ মানুষ: একজন নাগরিক তার ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে সমাজের কল্যাণের কথা ভাবে, যা সাধারণ মানুষ থেকে তাকে আলাদা করে।
- ৮। ⚖️ নৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা: চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা মানুষকে নৈতিকতা ও বিবেক দ্বারা পরিচালিত হতে শেখায়, যা প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে ভিন্ন।
- ৯।📜 আইনের শাসন: একটি আদর্শ সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, যেখানে আইন সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন এবং সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদটি ১৭৬২ সালে প্রকাশিত হয় এবং এটি ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল। তার এই মতবাদ কেবল ফরাসি বিপ্লব নয়, বরং আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের (১৭৭৬) মতো ঐতিহাসিক দলিলেও প্রভাব ফেলেছিল। রুশো তার “সামাজিক চুক্তি” গ্রন্থে সরাসরি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণাকে সামনে নিয়ে আসেন, যা তৎকালীন ইউরোপের রাজনৈতিক চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তার এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে হেগেল এবং কান্টের মতো দার্শনিকরা নিজেদের রাষ্ট্রতত্ত্ব গড়ে তোলেন। রুশোর ধারণাগুলো আধুনিক সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার অনেক দিককে প্রভাবিত করেছে। তার মতে, একটি রাষ্ট্র তখনই বৈধতা পায় যখন তা জনগণের সাধারণ ইচ্ছার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ছিল এক বিপ্লবী ধারণা।

