- readaim.com
- 0
উত্তর।।মুখবন্ধ: জ্যাঁ-জ্যাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (General Will) তত্ত্বটি রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই তত্ত্বটি ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। রুশোর মতে, একটি স্বাধীন ও সুসংগঠিত সমাজের ভিত্তি হলো সাধারণ ইচ্ছা, যা জনগণের সামগ্রিক মঙ্গলের জন্য কাজ করে। এই তত্ত্বের মাধ্যমে রুশো রাষ্ট্রের বৈধতা এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন।
রুশোর সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্বটি বুঝতে হলে প্রথমেই ব্যক্তিগত ইচ্ছা (Particular Will) এবং সকলের ইচ্ছার (Will of All) মধ্যেকার পার্থক্য বোঝা জরুরি।
- ব্যক্তিগত ইচ্ছা: এটি হলো একজন মানুষের নিজস্ব, সংকীর্ণ এবং স্বার্থপর ইচ্ছা। এটি কেবল নিজের ভালো চায়, সমাজের অন্য মানুষের কথা ভাবে না।
- সকলের ইচ্ছা: এটি হলো সমাজের সকল মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছার সমষ্টি। এটি একটি গাণিতিক যোগফলের মতো, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব ভালো-মন্দের হিসাব থাকে।
- সাধারণ ইচ্ছা: এটি হলো সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল বা কল্যাণকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ইচ্ছা। এটি কোনো একক ব্যক্তির স্বার্থে কাজ করে না, বরং পুরো সমাজের জন্য যা ভালো, তা-ই প্রকাশ করে। রুশো মনে করতেন, সাধারণ ইচ্ছা সবসময় সঠিক এবং ন্যায়সঙ্গত হয়। এটি হলো সার্বভৌম ক্ষমতার মূল উৎস।
রুশোর মতে, একটি আদর্শ সমাজে প্রতিটি নাগরিক তার ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে সাধারণ ইচ্ছার অধীনে নিজেকে সমর্পণ করে। এর ফলে সে ব্যক্তি স্বাধীনতা হারায় না, বরং এক নতুন ধরনের স্বাধীনতা অর্জন করে—যা সমাজের অংশ হিসেবে পাওয়া স্বাধীনতা। এই সাধারণ ইচ্ছা রাষ্ট্রের আইন-কানুন এবং নীতি নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যখন কোনো সরকার এই সাধারণ ইচ্ছাকে অনুসরণ করে, তখনই তা জনগণের কাছে বৈধতা লাভ করে।
রুশো বলেন, যদি কোনো নাগরিক সাধারণ ইচ্ছাকে মেনে চলতে অস্বীকার করে, তবে তাকে বাধ্য করা উচিত। কারণ, তাকে বাধ্য করা মানে তাকে স্বাধীন হতে সাহায্য করা। অর্থাৎ, সে নিজের ভুল ইচ্ছার দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে সমাজের বৃহত্তর মঙ্গলের অংশ হতে পারে। এই ধারণাটি আধুনিক গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব এবং আইন-কানুন মেনে চলার নীতির পেছনে এক শক্তিশালী দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করে।
উপসংহার: রুশোর সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্বটি আধুনিক গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, একটি সুস্থ এবং স্বাধীন সমাজের জন্য জনগণের সামগ্রিক কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। এই ধারণাটি থেকেই রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যেকার সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায় এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তার বৈধতা ও ক্ষমতার উৎস খুঁজে পায়।
রুশোর মতে, সাধারণ ইচ্ছা হলো সমাজের সকল মানুষের যৌথ মঙ্গলের প্রতিচ্ছবি, যা সবসময় সঠিক এবং ন্যায়সঙ্গত।
রুশোর এই তত্ত্বটি ১৭৬২ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সামাজিক চুক্তি’ (The Social Contract)-এ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। এই বইটি ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯)-এর সময় বিপ্লবীদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে এবং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়।

