- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মানুষের জীবনযাত্রার ইতিহাসে কৃষিকাজের পর শিল্প বিপ্লব এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এই বিপ্লবের হাত ধরে পুরনো সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয় এবং নতুন এক সমাজব্যবস্থার জন্ম হয়, যাকে আমরা শিল্প সমাজ হিসেবে চিনি। এই সমাজ হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে কৃষি বা হস্তশিল্পের পরিবর্তে শিল্প-কারখানাভিত্তিক উৎপাদনই অর্থনীতির মূল ভিত্তি। এটি কেবল অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও এক প্রতিচ্ছবি।
শাব্দিক অর্থে, শিল্প সমাজ বলতে সেই সমাজকে বোঝানো হয় যেখানে শিল্প-কারখানা বা যান্ত্রিক উৎপাদনই সমাজের মূল চালিকাশক্তি।
এই সমাজ মূলত কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজ থেকে আধুনিক নগরকেন্দ্রিক সমাজে উত্তরণের একটি প্রক্রিয়া। শিল্প সমাজে কৃষি উৎপাদনের পরিবর্তে কলকারখানা, প্রযুক্তি এবং যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এর ফলে উৎপাদনশীলতা বহু গুণ বেড়ে যায়, মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে ভিড় করে এবং নতুন নতুন পেশা ও জীবনযাত্রার মান তৈরি হয়। এই সমাজে মানুষের জীবন কেবল কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল থাকে না, বরং শিল্প উৎপাদনের সাথে জড়িত বিভিন্ন পেশায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।
বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক শিল্প সমাজের সংজ্ঞা দিয়েছেন। নিচে তাদের কিছু উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১। অগবার্ন (Ogburn) এবং নিমকফ (Nimkoff) এর মতে, শিল্প সমাজ হলো এমন এক সমাজ, যেখানে যান্ত্রিক ও রাসায়নিক শক্তির সাহায্যে উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। (An industrial society is one in which production is carried on by the use of mechanical and chemical power.)
২। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim) এর মতে, শিল্প সমাজ হলো সেই সমাজ, যেখানে শ্রম বিভাজন এবং পেশাগত বিশেষীকরণ উচ্চ মাত্রায় বিদ্যমান থাকে, যা সমাজের কার্যকারিতাকে আরও জটিল ও আন্তঃনির্ভরশীল করে তোলে। (An industrial society is one in which division of labor and occupational specialization are highly developed, making the functioning of society more complex and interdependent.)
৩। কার্ল মার্কস (Karl Marx) এর মতে, শিল্প সমাজ হলো পুঁজিপতি এবং শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যেকার একটি দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্ক, যেখানে পুঁজিপতিরা উৎপাদনের উপায়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে এবং শ্রমজীবী শ্রেণি তাদের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়। (An industrial society is a conflicted relationship between the capitalist and working classes, where the capitalists control the means of production and the working class is forced to sell its labor.)
৪। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) শিল্প সমাজকে একটি যুক্তিবাদী এবং আমলাতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে দেখেছেন, যেখানে আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের বিভিন্ন দিককে নিয়ন্ত্রণ করে এবং কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে। (Max Weber viewed industrial society as a rationalized and bureaucratic society, where modern institutions regulate various aspects of society and influence employment, education, and other social structures.)
৫। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo) এর মতে, শিল্প সমাজ হলো এমন এক সমাজ, যেখানে প্রযুক্তি এবং কারিগরি জ্ঞান উৎপাদনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যা সমাজের কাঠামো এবং মূল্যবোধে গভীর পরিবর্তন আনে। (An industrial society is one in which technology and technical knowledge act as the primary basis for production, leading to profound changes in social structure and values.)
৬। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary) অনুসারে, শিল্প সমাজ হলো এমন একটি সমাজ যা শিল্প দ্বারা চিহ্নিত, যেখানে পণ্য উৎপাদন ও পরিষেবার জন্য যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করা হয়। (An industrial society is a society characterized by industry, with a heavy reliance on mechanization and technology for the production of goods and services.)
৭। অধ্যাপক ফিফনার (P. Fiffner) এবং প্রেসথাস (Presthus) এর মতে, শিল্প সমাজ হলো এমন এক সমাজ, যেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং এটি সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। (An industrial society is one where industrial enterprises expand widely and become the focal point of social life.)
শিল্প সমাজ হলো এমন এক উন্নত সমাজব্যবস্থা যা আধুনিক প্রযুক্তি, যান্ত্রিকীকরণ এবং ব্যাপক শিল্পায়নের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এখানে অর্থনীতি, পেশাগত জীবন এবং সামাজিক সম্পর্কগুলো কৃষিকাজের পরিবর্তে শিল্প উৎপাদন ও পরিষেবা খাতের উপর নির্ভরশীল। এই সমাজে শ্রম বিভাজন, নগরকেন্দ্রিকতা এবং সামাজিক স্তরবিন্যাস পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জটিল এবং সুসংগঠিত।
উপসংহার: শিল্প সমাজ আধুনিক সভ্যতার এক অপরিহার্য অঙ্গ। এটি মানব ইতিহাসের সেই অধ্যায়, যেখানে মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা এবং সামাজিক কাঠামোতে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। ১৮ শতকে শুরু হওয়া এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক উৎপাদন বাড়ায়নি, বরং মানুষের জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং জীবনযাত্রার মানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যদিও এই সমাজ অনেক নতুন সমস্যা যেমন: পরিবেশ দূষণ, সামাজিক বৈষম্য এবং শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ তৈরি করেছে, তবুও এটি আধুনিক বিশ্বের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
শিল্প সমাজ হলো এমন এক সমাজ, যেখানে যন্ত্র এবং কারখানার ব্যবহার সমাজের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
১৯৮০ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে শিল্প উৎপাদন মোট দেশজ উৎপাদনের ৬০% ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে, পশ্চিমা দেশগুলোর প্রায় ৭০% কর্মজীবী মানুষ শিল্প ও পরিষেবা খাতে নিয়োজিত ছিল, যা কৃষিভিত্তিক সমাজের চিত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটেনে শুরু হওয়া এই পরিবর্তন সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, যা বিশ্ব অর্থনীতি এবং সামাজিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।

