- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সতীদাহ প্রথা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের একটি প্রাচীন ও অত্যন্ত বিতর্কিত সামাজিক কুসংস্কার। এই প্রথা অনুযায়ী, কোনো পুরুষের মৃত্যুর পর তার সদ্য বিধবা স্ত্রীকে স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় সহমরণে যেতে বাধ্য করা হতো। ‘সতী’ শব্দের অর্থ হলো ‘পুণ্যবতী নারী’ এবং ‘দাহ’ অর্থ হলো ‘দহন’। তাই সতীদাহ প্রথার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘পুণ্যবতী নারীর আত্মাহুতি’। এটি শুধু একটি ধর্মীয় প্রথা ছিল না, বরং নারীর প্রতি সমাজের চরম অবহেলা ও বৈষম্যের এক করুণ দৃষ্টান্ত ছিল।
সতীদাহ প্রথা: সতীদাহ হল হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিধবাদের একটি প্রাচীন ও বিতর্কিত প্রথা। এই প্রথা অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী স্বামীর চিতায় স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বক সহমরণে যেত। ‘সতী’ শব্দের অর্থ হলো ‘সৎ নারী’ বা ‘পুণ্যবতী নারী’, এবং ‘দাহ’ শব্দের অর্থ হলো ‘দহন’ বা ‘পুড়িয়ে ফেলা’। তাই সতীদাহ প্রথার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘সৎ নারীর দহন’।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এই প্রথার উৎস সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, এই প্রথাটি মূলত রাজপুত সম্প্রদায়ের মধ্যে শুরু হয়েছিল। যখন কোনো যুদ্ধে রাজপুত যোদ্ধা মারা যেতেন, তখন তার স্ত্রীরা শত্রুদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে নিজেরা চিতায় আত্মাহুতি দিতেন। তবে সময়ের সাথে সাথে এই প্রথাটি একটি ধর্মীয় রীতিতে রূপান্তরিত হয় এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথার উৎপত্তি ও বিকাশ: সতীদাহ প্রথার সঠিক উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তবে অনেকে মনে করেন, এর শুরু হয়েছিল মূলত রাজপুতদের মধ্যে। যুদ্ধে যখন রাজপুত যোদ্ধারা পরাজিত হতেন, তখন তাদের স্ত্রীরা শত্রুদের হাত থেকে নিজেদের সম্মান বাঁচাতে স্বেচ্ছায় জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দিতেন, যা ‘জওহর’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এই আত্মাহুতির ঘটনাকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হয় এবং এটি সমাজের উচ্চশ্রেণির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সময়ের সাথে সাথে এটি একটি বাধ্যতামূলক প্রথায় পরিণত হয়, যেখানে বিধবাকে জোরপূর্বক চিতায় তোলা হতো।
ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস: প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে সতীদাহের সুস্পষ্ট কোনো বিধান নেই, কিন্তু কিছু পণ্ডিত এটিকে বৈধতা দিতে বিভিন্ন শ্লোক ও ব্যাখ্যা ব্যবহার করেন। তাদের মতে, সতীদাহের মাধ্যমে স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য প্রকাশ করে এবং এর ফলে তারা দুজনেই স্বর্গে স্থান পান। বিশ্বাস করা হতো যে, সতীর আত্মত্যাগ তার পরিবারের জন্য পুণ্য বয়ে আনত। প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে সতীদাহের সুস্পষ্ট কোনো উল্লেখ না থাকলেও, কিছু ধর্মীয় নেতা এই প্রথাকে বৈধতা দিতে বিভিন্ন শ্লোকের অপব্যাখ্যা করতেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে, সতীদাহের মাধ্যমে নারী তার স্বামীর প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য প্রকাশ করে এবং এর ফলে তারা দুজনেই স্বর্গে স্থান লাভ করেন। সমাজে এমন একটি বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, একজন সতী নারী তার পরিবার ও বংশের জন্য পুণ্য বয়ে আনেন। এই ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসই প্রথাটিকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল।
নারীর করুণ পরিণতি: একজন নারীর জীবনে সতীদাহ ছিল এক চরম যন্ত্রণার প্রতীক। স্বামীর মৃত্যুর পর একজন বিধবা নারীর জীবন হয়ে উঠত দুর্বিষহ। তাদের সামাজিক মর্যাদা কমে যেত, অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো এবং প্রায়শই পরিবারের বোঝা হিসেবে গণ্য করা হতো। এই কারণে, অনেকেই সামাজিক চাপ এড়াতে বা পরিবারের বোঝা না হয়ে থাকতে স্বেচ্ছায় সতীদাহ বেছে নিতেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে, পারিবারিক সম্পত্তি দখল বা অন্য কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য নারীকে জোরপূর্বক চিতায় পুড়িয়ে মারা হতো।
সামাজিক চাপ ও বাস্তবতা: সতীদাহ প্রথা অনেক সময় স্বেচ্ছায় হলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ছিল সামাজিক চাপ ও জোরপূর্বক একটি প্রক্রিয়া। যখন একজন নারীর স্বামী মারা যেত, তখন সমাজে তার স্থান হতো খুবই নগণ্য। বিধবাদের অনেক সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো এবং তাদের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠত। এই কারণে অনেক নারী বাধ্য হয়ে এই প্রথা বেছে নিতেন। অন্যদিকে, অনেক সময় স্বামীর সম্পত্তি দখলের জন্যও পরিবারের সদস্যরা স্ত্রীকে সতী হতে বাধ্য করত।
আইন ও বিলুপ্তি: সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে অনেক সমাজ সংস্কারক ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানান। রাজা রামমোহন রায় এই প্রথার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন। তিনি তার ‘সতীদাহ প্রথা ও নারীর অধিকার’ নিয়ে লেখালেখি ও আন্দোলন শুরু করেন। তার প্রচেষ্টার ফলে ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক সতীদাহ প্রথাকে আইনত নিষিদ্ধ করেন।
সংস্কার আন্দোলন ও বিলুপ্তি: সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে ভারতে প্রথম জোরালো আন্দোলন শুরু করেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি নিজে তার ভ্রাতৃবধূকে সতীদাহের শিকার হতে দেখেছিলেন, যা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। এরপর তিনি এই প্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার ও লেখালেখি শুরু করেন। তার ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে এবং ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় ১৮২৯ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক আইন করে এই প্রথাকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই আইন ভারতীয় সমাজে নারীর মর্যাদা রক্ষায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
প্রভাব: সতীদাহ প্রথার বিলুপ্তি ভারতীয় সমাজে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। এটি নারীর মর্যাদা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল এবং আধুনিক সমাজ সংস্কার আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে। যদিও প্রথাটি বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু এর কুপ্রভাব আজও ভারতীয় সমাজে দেখা যায়।
উপসংহার: সতীদাহ প্রথা ছিল এক নির্মম সামাজিক প্রথা যা হাজার হাজার নারীর জীবন কেড়ে নিয়েছিল। এটি কেবল একটি ধর্মীয় কুসংস্কার ছিল না, বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চরম নিষ্ঠুরতার এক জঘন্য উদাহরণ ছিল। রাজা রামমোহন রায় ও লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক-এর মতো সংস্কারকদের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণেই এই অমানবিক প্রথাটির অবসান সম্ভব হয়েছিল। যদিও এই প্রথা আজ বিলুপ্ত, তবুও এটি আমাদের সমাজে নারীর মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
১৮১৫ সাল থেকে ১৮১৮ সালের মধ্যে শুধু বাংলাতেই প্রায় ৮০০০ সতীদাহের ঘটনা ঘটেছিল। ব্রিটিশরা ১৭৯৮ সালে প্রথম এই প্রথাকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। রাজা রামমোহন রায় ১৮১৮ সাল থেকে তার আন্দোলন শুরু করেন এবং ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর রেগুলেশন ১৭ আইন দ্বারা সতীদাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৯২৯ সালে এই নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করে।

