- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সমাজকর্ম হলো এমন একটি মানবিক পেশা, যা ব্যক্তি, দল এবং সমষ্টির সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে এবং তাদের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। এটি এমন এক পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া যা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। সমাজকর্মের মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তারা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারে এবং সমাজে একটি সুস্থ ও কার্যকরী জীবনযাপন করতে পারে।
শাব্দিক অর্থ: সমাজকর্মের শাব্দিক অর্থ হলো “সামাজিক কাজ” বা “সমাজের জন্য কাজ”। এটি এমন একটি সুসংগঠিত এবং বিজ্ঞানসম্মত কর্মপ্রক্রিয়া, যা সমাজের পিছিয়ে পড়া এবং অসহায় মানুষকে সাহায্য করে।
মাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতিগুলো হলো সেই বিশেষ কৌশল ও প্রক্রিয়া, যা একজন পেশাদার সমাজকর্মী মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহার করেন। এই পদ্ধতিগুলো সমাজকর্মকে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মৌলিকভাবে, এই পদ্ধতিগুলো তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: ব্যক্তি সমাজকর্ম, দল সমাজকর্ম, এবং সমষ্টি উন্নয়ন ও সংগঠন। এই তিনটি পদ্ধতি একে অপরের পরিপূরক এবং সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে কাজ করে।
১। হেলেন এইচ. পার্লম্যান (Helen H. Perlman): তিনি বলেন, “সমাজকর্ম হলো এমন এক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে একটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি, একটি বিশেষ স্থানে, একজন পেশাদার প্রতিনিধির সাহায্যে তার ব্যক্তিত্ব, সমাজ ও সংস্কৃতিকে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে।” (Social casework is a process used by certain human welfare agencies to help individuals to cope more effectively with their problems in social functioning.)
২। ডব্লিউ. এ. ফ্রিডল্যান্ডার (W. A. Friedlander): তার মতে, “সমাজকর্ম হলো একটি পেশাদার সেবা, যা ব্যক্তি, দল ও সমষ্টিকে তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোকে উন্নত করতে, নিজেদের সম্পদ কাজে লাগাতে, এবং নিজেদের সমস্যার সমাধানে সক্ষম করে।” (Social work is a professional service, based on scientific knowledge and skill in human relations, which assists individuals, alone or in groups, to attain social relationships that allow them to develop their full potential.)
৩। মেরি রিচমন্ড (Mary Richmond): তার বিখ্যাত বই “Social Diagnosis”-এ তিনি বলেছেন, “সমাজকর্ম হলো মানুষের মধ্যে এবং তাদের পরিবেশের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করার একটি শিল্প।” (Social work is the art of bringing people into a harmonious relationship with their environment.)
৪। আন্ডারসন (Anderson): তিনি সমাজকর্মকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন, যেখানে “একজন ব্যক্তি, তার নিজের সক্ষমতাকে ব্যবহার করে, সমাজ ও তার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে পারে।” (Social work is a process of helping individuals to adjust to their social environment by making use of their inherent capacities.)
৫। হেয়ার ও ডেভিস (Hare and Davis): তাদের মতে, “সমাজকর্ম হচ্ছে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও পরিবেশের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য এক প্রকার সাহায্যকারী কার্যকলাপ।” (Social work is a helping activity which aims at resolving problems between individuals and their environment.)
৬। মিস রবিনসন (Miss Robinson): তার মতে, “সমাজকর্ম হলো এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য তাদের সমস্যার সমাধানে সাহায্য করা হয়।” (Social work is a process by which human needs are met through helping people to resolve their problems of living.)
৭। হেলেন এইচ. পার্লম্যান-এর মতে সমাজকর্মের মূল উপাদান চারটি: ব্যক্তি (Person), সমস্যা (Problem), স্থান (Place) এবং প্রক্রিয়া (Process)। এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো “4 Ps”।
উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি, সমাজকর্ম হলো এমন একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও পেশাদার কার্যক্রম যা বিভিন্ন পদ্ধতি ও কলাকৌশল ব্যবহার করে ব্যক্তি, দল ও সমষ্টির সমস্যা সমাধানে এবং তাদের সুপ্ত সম্ভাবনা বিকাশে সহায়তা করে। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা, যাতে তারা নিজেদের সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে একটি উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।
উপসংহার: সমাজকর্ম শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, এটি একটি মানবিক দর্শন। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করা এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। সমাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতিগুলো এই দর্শনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য একটি কার্যকরী কাঠামো প্রদান করে। এই পদ্ধতিগুলোর যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এটি মানুষকে শুধুমাত্র বর্তমান সমস্যা থেকে মুক্তি দেয় না, বরং ভবিষ্যতের জন্য তাদের আরও শক্তিশালী করে তোলে।
সমাজকর্ম হলো একটি পদ্ধতিগত পেশা, যা মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য কাজ করে।
উনিশ শতকের শেষের দিকে শিল্প বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক দারিদ্র্য ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা মোকাবেলায় সমাজকর্মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া শুরু হয়। ১৯১৭ সালে মেরি রিচমন্ডের “Social Diagnosis” বইটির প্রকাশকে সমাজকর্মের একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০০০ সালের একটি আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সমাজকর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ মানব সেবামূলক পেশা হিসেবে স্বীকৃত।

