- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সমাজকর্ম দর্শন হল সমাজকর্মের মূলনীতি, লক্ষ্য এবং আদর্শের একটি গভীর আলোচনা। এটি শুধু কী করা উচিত তা নিয়ে কথা বলে না, বরং কেন করা উচিত তা নিয়েও বিশ্লেষণ করে। এই দর্শন সমাজকর্মের পেশাদারদের পথ দেখায়, তাদের কাজকে একটি নৈতিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করে। সমাজের প্রতিটি স্তরে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি একটি অপরিহার্য দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
সমাজকর্ম দর্শন হল সমাজকর্মের মূলনীতি, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের একটি সামগ্রিক বিশ্লেষণ। এটি সমাজকর্ম পেশার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কার্যপদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, কেন এবং কীভাবে সমাজকর্ম মানুষের কল্যাণে কাজ করে।
শাব্দিক অর্থ: সমাজকর্ম (Social Work): ‘Social’ শব্দের অর্থ সামাজিক বা সমাজ সম্পর্কিত এবং ‘Work’ শব্দের অর্থ কাজ বা কর্ম। অর্থাৎ, এটি সমাজের সমস্যা সমাধানের জন্য পরিচালিত কাজ।
দর্শন (Philosophy): ‘Philosophy’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Philos’ (প্রেম) এবং ‘Sophia’ (জ্ঞান) থেকে এসেছে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা। দর্শনের মাধ্যমে কোনো বিষয়ের গভীরতম সত্য, এর নীতি এবং মূল্যবোধকে বোঝা যায়।
সুতরাং, সমাজকর্ম দর্শন বলতে বোঝায় সমাজকর্ম সংক্রান্ত জ্ঞান, নীতি এবং মূল্যবোধের একটি গভীর ও সুসংগঠিত আলোচনা।
এখানে যারা সরাসরি সমাজকর্মের সংজ্ঞা দিয়েছেন তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উক্তি দেওয়া হলো:
১। হেডলি বি. অ্যাডামস (Hadley B. Adams) এর মতে, “সমাজকর্ম দর্শন হলো সেই নীতি, মূল্যবোধ এবং ধারণার সমন্বয়, যা মানুষের মধ্যে সম্মান, মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।” (Social work philosophy is the synthesis of principles, values, and ideas that work towards establishing dignity, respect, and social justice among human beings.)
২। রিচার্ড টি. ডিনার্ট (Richard T. Deinart) বলেন, “সমাজকর্ম দর্শন হলো এমন একটি বিশ্বাস ব্যবস্থা, যা মানুষকে সাহায্য করার জন্য একটি নৈতিক এবং যৌক্তিক ভিত্তি প্রদান করে।” (Social work philosophy is a belief system that provides a moral and logical foundation for helping people.)
৩। মেরি রিচমন্ড (Mary Richmond), যিনি আধুনিক সমাজকর্মের জননী হিসেবে পরিচিত, সমাজকর্মকে “মানুষ এবং তাদের সামাজিক পরিবেশের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের বিজ্ঞান” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (Social work is the science of establishing harmony between people and their social environment.)
৪। ডাব্লিউ. এ. ফ্রেডল্যান্ডার (W. A. Friedlander) এর মতে, “সমাজকর্ম হলো একটি পেশাগত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যা ব্যক্তির সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে জাগিয়ে তোলে এবং পরিবেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নত করে।” (Social work is a professional and scientific method that helps individuals solve their problems by arousing their inner strength and improving their relationship with the environment.)
৫। স্যার উইলিয়াম বেভারেজ (Sir William Beveridge) যদিও সরাসরি সমাজকর্মের সংজ্ঞা দেননি, তবে তার বিখ্যাত ‘বেভারেজ রিপোর্ট’ সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণের ধারণা দিয়েছে, যা সমাজকর্ম দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি মানুষের জীবনের পাঁচটি প্রধান সমস্যা—দারিদ্র্য, রোগ, অজ্ঞতা, নোংরামি এবং বেকারত্ব—থেকে মুক্তি নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন।
৬। ড. আর. আর. সিং (Dr. R. R. Singh) সমাজকর্মকে একটি সাহায্যকারী পেশা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার লক্ষ্য হলো “ব্যক্তি, দল এবং সমষ্টির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যাতে তারা নিজেদের সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।” (Social work is described as a helping profession, whose goal is to increase the capacity of individuals, groups, and communities so that they can solve their own problems and influence the process of social change.)
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি, সমাজকর্ম দর্শন হলো এমন একটি বিশ্বাস এবং নৈতিক কাঠামো, যা মানুষের মর্যাদা ও স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজকর্মের পেশাদারদের পরিচালিত করে। এটি মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধনের জন্য তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের একটি সমন্বয়।
উপসংহার: সমাজকর্ম দর্শন শুধু কিছু নীতিমালার সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া যা সমাজে বিদ্যমান সমস্যা ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। এটি মানবতাবাদী মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পথনির্দেশক, যা প্রতিটি সমাজকর্মীকে তাদের দায়িত্ব, নৈতিকতা এবং লক্ষ্যের প্রতি সচেতন থাকতে সাহায্য করে। এই দর্শন মানুষকে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে শেখায় এবং একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে অবদান রাখে।
সমাজকর্ম দর্শন হলো মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করার জন্য সমাজকর্মের মূলনীতি ও মূল্যবোধের একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি।
উনিশ শতকের শেষের দিকে, বিশেষত ১৮৬৯ সালে লন্ডনে চ্যারিটি অর্গানাইজেশন সোসাইটি (COS) এবং ১৮৮০ এর দশকে সেটেলমেন্ট হাউসের (Settlement House) মতো আন্দোলনগুলির মাধ্যমে আধুনিক সমাজকর্মের গোড়াপত্তন হয়। ১৯২১ সালে আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব সোশ্যাল ওয়ার্কার্স (AASW) গঠিত হয়। ১৯২৯ সালের মহামন্দার পর ১৯৩৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘সামাজিক নিরাপত্তা আইন’ (Social Security Act) পাস হয়, যা সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। বর্তমানে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, সমাজকর্ম একটি দ্রুত বর্ধনশীল পেশা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ২০২৫ সাল নাগাদ আরও ২৫% বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা হয়েছে।

