- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মানব সমাজে নানা ধরনের বৈষম্য দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সামাজিক অসমতা। এই অসমতা সমাজে মানুষের মর্যাদা, সুযোগ এবং সম্পদ বণ্টনে গভীর প্রভাব ফেলে। যখন কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় বেশি সুবিধা পায়, তখন সমাজে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, যা নানা ধরনের সমস্যার জন্ম দেয়। এই প্রবন্ধে আমরা সামাজিক অসমতার ধারণা, এর শাব্দিক অর্থ, বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষকদের দেওয়া সংজ্ঞা এবং এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করব।
শাব্দিক অর্থ: সামাজিক অসমতা বা ‘social inequality’ শব্দটির শাব্দিক অর্থ হলো ‘সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য বা পার্থক্য’। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে সমাজে সম্পদ, সুযোগ, সম্মান এবং ক্ষমতা মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয় না।
সামাজিক অসমতা বলতে সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদ, সুযোগ, সম্মান, এবং ক্ষমতার অসম বণ্টনকে বোঝায়। এটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, বরং জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, শিক্ষা, বয়স, এবং সামাজিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এর ফলে সমাজের কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় কম সুযোগ ও সম্পদ নিয়ে জীবনযাপন করে।
১। কার্ল মার্কস (Karl Marx): কার্ল মার্কসের মতে, সামাজিক অসমতার মূল কারণ হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। তিনি বলেন, সমাজে দুটি প্রধান শ্রেণি রয়েছে—পুঁজিবাদী (Bourgeoisie) এবং শ্রমিক (Proletariat)। এই দুটি শ্রেণির মধ্যে সম্পর্কের অসমতা থেকেই সামাজিক অসমতা তৈরি হয়।
২। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ম্যাক্স ওয়েবার মনে করতেন যে সামাজিক অসমতা শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়, বরং মর্যাদা (status) এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার (power) কারণেও ঘটে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক সম্মান এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা—এই তিনটি ভিন্ন মাত্রা সমাজের স্তরবিন্যাস তৈরি করে।
৩। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte): অগাস্ট কোঁৎ যদিও সরাসরি সামাজিক অসমতার সংজ্ঞা দেননি, তবে তিনি সমাজকে একটি জৈব কাঠামো (organic structure) হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সুসংবদ্ধতা থাকা প্রয়োজন, এবং এই সংবদ্ধতা না থাকলে অসমতা তৈরি হতে পারে।
৪। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): এমিল ডুর্খেইমের মতে, শ্রমের বিশেষীকরণ (division of labor) সামাজিক অসমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি বলেন, আধুনিক সমাজে শ্রম বিভাজনের কারণে বিভিন্ন পেশার মধ্যে মর্যাদা ও সুযোগের পার্থক্য তৈরি হয়, যা অসমতার জন্ম দেয়।
৫। নিমকফ (Nimkoff): ওগবার্ন ও নিমকফ তাদের গবেষণা অনুযায়ী বলেন, সামাজিক অসমতা হলো সমাজের বিভিন্ন স্তরে মানুষের মধ্যে সুযোগ ও সম্মানের অসম বণ্টন। (Social inequality is the unequal distribution of opportunities and honors among people in different strata of society.)
৬। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski): হ্যারল্ড লাস্কি বলেন, “সামাজিক অসমতা হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে সমাজে কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় কম সুবিধা ও সুযোগ পায়।” (Social inequality is a condition in which some people in society have fewer advantages and opportunities than others.)
৭। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): এদের মতে, সামাজিক অসমতা হলো সামাজিক কাঠামোয় ক্ষমতার অসম বণ্টন। (Social inequality is the unequal distribution of power within a social structure.)
উপরের সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা বলতে পারি, সামাজিক অসমতা হলো সমাজের এমন একটি অবস্থা যেখানে সম্পদ, সুযোগ, ক্ষমতা, এবং সামাজিক মর্যাদা জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, শিক্ষা বা অর্থনৈতিক অবস্থার মতো নানা কারণে মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয় না, যার ফলে সমাজে কিছু গোষ্ঠী অন্যদের তুলনায় বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত হয় এবং অন্যরা বঞ্চিত হয়।
উপসংহার: সামাজিক অসমতা মানব সমাজের একটি জটিল ও গভীর সমস্যা, যা কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সুযোগের অসম বণ্টনেরও প্রতিফলন। এই অসমতা সমাজে বিশৃঙ্খলা, অসন্তোষ, এবং সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনের জন্য এই অসমতা দূর করা অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক সুযোগের সমান বণ্টন নিশ্চিত করা।
সামাজিক অসমতা হলো সমাজে মানুষের মর্যাদা, সম্পদ, সুযোগ এবং ক্ষমতার অসম বণ্টন।
২০২৪ সালের অক্সফাম (Oxfam) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ১% ধনী মানুষের কাছে বাকি ৯৯% মানুষের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সম্পদ রয়েছে। একটি সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অসমতা আরও বেড়েছে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, আধুনিক যুগেও সামাজিক অসমতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

