- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সামাজিক আন্দোলন হলো সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থা বা রীতিনীতির বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এটি একটি সুসংগঠিত বা স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়াস যা সমাজের কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে চায়। এই আন্দোলনগুলো সমাজের ভেতরে থাকা অন্যায়, বৈষম্য বা অভাব দূর করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং সমাজের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
শাব্দিক অর্থ: সামাজিক আন্দোলন শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘Social Movement’। এখানে, ‘Social’ মানে সমাজ সম্পর্কিত এবং ‘Movement’ মানে আন্দোলন বা গতি। অর্থাৎ, সমাজের মধ্যে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একদল মানুষের একত্রিত হয়ে কাজ করা।
সামাজিক আন্দোলন হলো একদল মানুষের সংগঠিত বা স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টা, যা সমাজের বিদ্যমান কোনো ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রতিরোধ বা সংরক্ষণের জন্য পরিচালিত হয়। এই আন্দোলনগুলো সাধারণত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়। এগুলোর মাধ্যমে মানুষ তাদের দাবি-দাওয়া, অসন্তোষ বা আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রকাশ করে এবং সমাজের বৃহত্তর পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করে। এটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয় এবং এর একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্র রয়েছে। এটি সমাজের গতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সামাজিক আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছেন। এখানে তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১। অগবার্ন (Ogburn) ও নিমকফ (Nimkoff): তারা মনে করেন, সামাজিক আন্দোলন হলো এমন একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা যার মাধ্যমে একটি বৃহৎ সংখ্যক মানুষ তাদের সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি পরিবর্তন করতে চায়।
২। কার্ল মার্কস (Karl Marx): মার্কস সামাজিক আন্দোলনকে শ্রেণি সংগ্রামের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। তিনি মনে করতেন, সমাজের শ্রেণি বৈষম্য ও শোষণ থেকে সামাজিক আন্দোলনের সৃষ্টি হয় এবং এটি নতুন সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার।
৩। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ওয়েবার সামাজিক আন্দোলনকে ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের পরিবর্তনের জন্য পরিচালিত একটি সম্মিলিত কর্ম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ক্ষমতা, বিভাজন এবং প্রভাবের সম্পর্কের উপর জোর দিয়েছেন।
৪। রুডলফ হেডলে (Rudolph Heberle): তিনি সামাজিক আন্দোলনকে ‘যেকোনো বৃহৎ আকারের সামষ্টিক প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা সমাজের কিছু অংশের মধ্যে পরিবর্তনের জন্য পরিচালিত হয়।’
৫। জন উইলসন (John Wilson): জন উইলসন বলেন, “সামাজিক আন্দোলন হলো সমাজের বিদ্যমান কাঠামো ও নিয়ম-কানুনের পরিবর্তনের জন্য পরিচালিত একটি সংগঠিত প্রয়াস।”
৬। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski): যদিও তিনি সরাসরি সংজ্ঞা দেননি, তবে তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও জনগণের অধিকার নিয়ে তার লেখায় আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
৭। ডেভিড ই. আপ্টার (David E. Apter): তিনি সামাজিক আন্দোলনকে সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা সমাজের কোনো বিশেষ দিকে পরিবর্তন আনতে চায়।
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি, সামাজিক আন্দোলন হলো সমাজের বৃহত্তর গোষ্ঠীর একটি সম্মিলিত ও সচেতন প্রচেষ্টা, যা বিদ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রতিরোধ বা সংরক্ষণের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। এই আন্দোলনগুলো সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ, লক্ষ্য বা ইস্যুর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে এবং সমাজকে একটি নতুন দিকে চালিত করতে সাহায্য করে।
উপসংহার: সামাজিক আন্দোলন হলো পরিবর্তনের চাবিকাঠি। এটি মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর, যা সমাজের অন্যায়, বৈষম্য এবং অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এর মাধ্যমে সমাজ তার গতিশীলতা বজায় রাখে এবং নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যায়। এটি শুধু কোনো প্রতিবাদ নয়, বরং সমাজের অগ্রগতি ও বিবর্তনের একটি অপরিহার্য অংশ।
সামাজিক আন্দোলন হলো সমাজের কোনো প্রচলিত প্রথা বা ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রতিরোধ বা সংরক্ষণের জন্য পরিচালিত একদল মানুষের সংগঠিত বা স্বতঃস্ফূর্ত সম্মিলিত প্রয়াস।
১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলন (Civil Rights Movement) সামাজিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্দোলন (Climate Change Movements) ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ২০১৮ সালে সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গের ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ আন্দোলনটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২০ সালের গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক-এ প্রায় ৪০ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করে, যা সামাজিক আন্দোলনের ব্যাপকতা প্রমাণ করে। সামাজিক আন্দোলনগুলো প্রায়শই সামাজিক ন্যায়বিচার, লিঙ্গ সমতা এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে।

