- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সামাজিক চুক্তি মতবাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি ব্যাখ্যা করে। এই মতবাদ অনুযায়ী, মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার জন্য একটি কাল্পনিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করে। থমাস হবস্, জন লক ও জ্যাঁ-জ্যাক রুশো—এই তিন দার্শনিকের চিন্তাভাবনা এই মতবাদের বিকাশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। তাঁদের প্রত্যেকের ধারণা ছিল স্বতন্ত্র এবং সমাজের প্রকৃতি, মানুষের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ছিল মৌলিক পার্থক্য। এই নিবন্ধে আমরা তাঁদের মতামতের তুলনামূলক আলোচনা করব।
১। প্রকৃতির রাজ্য: এই তিন দার্শনিকের মতে, মানুষের জীবন রাষ্ট্র গঠনের আগে কেমন ছিল তা নিয়ে তাদের ধারণায় অনেক পার্থক্য ছিল। থমাস হবসের মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল ‘একাকী, দরিদ্র, জঘন্য, পাশবিক এবং ক্ষণস্থায়ী’। সেখানে কোনো নিয়ম-কানুন, নৈতিকতা বা বিচার ছিল না এবং মানুষ সর্বদাই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য একে অপরের সঙ্গে সহিংস সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। অন্যদিকে, জন লক এই অবস্থাকে এতটা ভয়াবহ মনে করেননি। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের কিছু প্রাকৃতিক অধিকার যেমন—জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার ছিল এবং এই অধিকারগুলো প্রাকৃতিক আইন দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। রুশো প্রকৃতির রাজ্যকে আরও ইতিবাচকভাবে দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষ সেই সময় ছিল নিষ্পাপ এবং শান্তিপ্রিয়, কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা হিংসা ছিল না। রুইশো মনে করতেন সভ্যতাই মানুষের মধ্যে হিংসা, লোভ ও অসমতা সৃষ্টি করেছে।
২। সামাজিক চুক্তির উদ্দেশ্য: হবসের কাছে, সামাজিক চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের প্রকৃতির রাজ্যের ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করা। মানুষ নিজেদের মধ্যে এক চুক্তি করে যার মাধ্যমে তারা তাদের সমস্ত ক্ষমতা একজন সার্বভৌম শাসকের হাতে তুলে দেয়। বিনিময়ে সেই শাসক তাদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করবে। এই চুক্তি ছিল একমুখী এবং অপরিবর্তনীয়। লক মনে করতেন, সামাজিক চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মানুষের বিদ্যমান প্রাকৃতিক অধিকারগুলো আরও ভালোভাবে রক্ষা করা। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতির রাজ্যে প্রাকৃতিক অধিকারগুলো সুরক্ষিত থাকলেও তা ছিল অসম্পূর্ণ। তাই, মানুষ একমত হয় এবং নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য একটি সরকার গঠন করে। রুশোর মতে, সামাজিক চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল এক নতুন ধরনের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা, যা ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে ‘সাধারণ ইচ্ছা’ দ্বারা পরিচালিত হবে।
৩। চুক্তির পক্ষ: সামাজিক চুক্তির এই তিন দার্শনিকের ধারণায়, চুক্তির পক্ষগুলো নিয়ে ভিন্নমত ছিল। হবসের মতে, এই চুক্তি শুধুমাত্র জনগণের নিজেদের মধ্যে হয়েছিল, শাসক এই চুক্তির কোনো পক্ষ ছিল না। এর ফলে, শাসক যেকোনো সময় চুক্তি ভঙ্গ করতে পারত, কিন্তু জনগণ তার বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারতো না। লক বিশ্বাস করতেন যে, চুক্তিটি দুই পক্ষ—জনগণ এবং শাসক—এর মধ্যে হয়েছিল। এই চুক্তি অনুযায়ী, শাসক জনগণের অধিকার রক্ষা করবে, এবং যদি শাসক এই চুক্তি ভঙ্গ করে, তবে জনগণ তাকে অপসারণ করতে পারবে। রুশো মনে করতেন, চুক্তিটি হয়েছিল সমাজের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে। এর ফলে, প্রত্যেক ব্যক্তি সমাজের সাধারণ ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে এবং বিনিময়ে সমগ্র সমাজের অংশ হিসেবে সে তার নিজের অধিকারগুলো ফিরে পাবে।
৪। শাসকের ক্ষমতা: হবসের মতে, সামাজিক চুক্তির ফলে সৃষ্ট শাসকের ক্ষমতা ছিল অসীম ও নিরঙ্কুশ। তিনি মনে করতেন, শাসন ক্ষমতাকে সীমিত করলে তা সমাজে আবার বিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। তাই, তিনি একজন স্বৈরাচারী শাসকের পক্ষপাতী ছিলেন, যাকে জনগণ কোনোভাবেই চ্যালেঞ্জ করতে পারতো না। লকের মতে, শাসকের ক্ষমতা ছিল সীমিত। শাসককে অবশ্যই জনগণের দ্বারা প্রদত্ত আইন অনুযায়ী চলতে হবে এবং জনগণের অধিকার রক্ষা করতে হবে। যদি শাসক এই শর্তগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণ তাকে প্রতিহত করার বা সরিয়ে দেওয়ার অধিকার রাখে। রুশোর মতে, কোনো নির্দিষ্ট শাসক নয়, বরং ‘সাধারণ ইচ্ছা’ই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। সরকার শুধুমাত্র সেই সাধারণ ইচ্ছার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে, এবং যদি সরকার সেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তবে জনগণ তাকে প্রতিহত করতে পারবে।
৫। মানবিক প্রকৃতি: হবস মানুষের প্রকৃতিকে মূলত স্বার্থপর এবং সহিংস হিসেবে দেখতেন। তাঁর মতে, মানুষ জন্মগতভাবে আত্মকেন্দ্রিক এবং কেবল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই কাজ করে। লক মানুষের প্রকৃতিকে যুক্তিসঙ্গত এবং সামাজিক হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি মনে করতেন, মানুষ প্রাকৃতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান জানাতে সক্ষম। রুশো মানুষের প্রকৃতিকে আরও ইতিবাচকভাবে দেখতেন। তিনি মনে করতেন, মানুষ জন্মগতভাবে নির্দোষ ও সহানুভূতিশীল। তাঁর মতে, সমাজের অসাম্য এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলেছে।
৬। স্বাধীনতার ধারণা: হবসের মতে, প্রকৃতির রাজ্যে কোনো স্বাধীনতা ছিল না, কেবল ভয় ও বিশৃঙ্খলা ছিল। সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে মানুষ তাদের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ত্যাগ করে বিনিময়ে নিরাপত্তা লাভ করে। এখানে স্বাধীনতা মানে হল আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে চলা। লকের মতে, স্বাধীনতার ধারণাটি প্রাকৃতিক অধিকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিনি মনে করতেন, স্বাধীনতা হলো অন্যের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের জীবন, সম্পত্তি ও শ্রমের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা। রুশোর মতে, প্রকৃত স্বাধীনতা হলো সাধারণ ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য। যখন কোনো ব্যক্তি সাধারণ ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তখন সে সমগ্র সমাজের অংশ হিসেবে নিজেকে ফিরে পায় এবং নিজের প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে।
৭। আইনের উৎস: হবসের মতে, আইন হলো শাসকের ইচ্ছা। শাসক যে আইন তৈরি করেন, তা জনগণের জন্য অবশ্যপালনীয় এবং এর কোনো বিরোধিতা করা যাবে না। লকের মতে, আইনের উৎস হলো জনগণের সম্মতি। আইন জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তৈরি হয়, এবং এর প্রধান কাজ হলো জনগণের প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষা করা। রুশোর মতে, আইন হলো ‘সাধারণ ইচ্ছা’র বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ ইচ্ছা হলো সমাজের সকল সদস্যের সমষ্টিগত ইচ্ছা, যা সমগ্র সমাজের মঙ্গলের জন্য কাজ করে।
৮। রাষ্ট্রের ভূমিকা: হবসের মতে, রাষ্ট্রের মূল ভূমিকা হলো নাগরিকদের মধ্যে শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করতে হবে। লকের মতে, রাষ্ট্রের মূল ভূমিকা হলো জনগণের প্রাকৃতিক অধিকার—জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি—রক্ষা করা। রাষ্ট্র একটি সীমিত ক্ষমতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান, যা জনগণের অধিকারের উপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। রুশোর মতে, রাষ্ট্র সাধারণ ইচ্ছাকে কার্যকর করার একটি মাধ্যম। রাষ্ট্র জনগণের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করবে এবং সাধারণ ইচ্ছার অধীনেই পরিচালিত হবে।
৯। ব্যক্তির অধিকার: হবসের মতে, সামাজিক চুক্তির পর ব্যক্তির কোনো বিশেষ অধিকার থাকে না, কেবল জীবন রক্ষার অধিকার ছাড়া। শাসক যদি জীবনহানির আশঙ্কা সৃষ্টি করে, তবে কেবল সেই পরিস্থিতিতেই ব্যক্তি শাসককে প্রতিরোধ করতে পারে। লকের মতে, সামাজিক চুক্তির পরও ব্যক্তির কিছু মৌলিক অধিকার থাকে, যেমন—জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার। এই অধিকারগুলো শাসকের ক্ষমতা দ্বারা সীমিত হতে পারে না। রুশোর মতে, সামাজিক চুক্তির পর ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে সমাজের অংশ হিসেবে কিছু অধিকার লাভ করে। এই অধিকারগুলো সাধারণ ইচ্ছার দ্বারা সুরক্ষিত।
১০। সরকারের ধরন: হবস একজন নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কেবল একজন শাসকের হাতেই থাকা উচিত, তাহলেই সমাজে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। লকের মতে, সরকার হবে সীমিত ক্ষমতা সম্পন্ন এবং জনগণের সম্মতি দ্বারা নির্বাচিত। তিনি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র বা সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষপাতী ছিলেন। রুশোর মতে, সরকার হবে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের প্রতিরূপ। তিনি মনে করতেন, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো প্রতিনিধির হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। জনগণ সরাসরি আইন প্রণয়নে অংশ নেবে।
১১। ক্ষমতার উৎস: হবসের মতে, ক্ষমতার উৎস হলো জনগণের নিজেদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে জনগণ তাদের ক্ষমতা এককভাবে একজন সার্বভৌম শাসকের হাতে তুলে দেয়। লকের মতে, ক্ষমতার উৎস হলো জনগণের সম্মতি। জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতা প্রদান করে এবং এই ক্ষমতা সীমিত। রুশোর মতে, ক্ষমতার উৎস হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব বা ‘সাধারণ ইচ্ছা’। তিনি মনে করতেন, সার্বভৌম ক্ষমতা সর্বদা জনগণের হাতেই থাকে এবং তা হস্তান্তরযোগ্য নয়।
১২। রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক: হবস রাষ্ট্র ও সমাজকে অভিন্ন মনে করতেন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র ছাড়া কোনো সমাজের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। তাই, রাষ্ট্রের অস্তিত্বই সমাজের ভিত্তি। লক রাষ্ট্র ও সমাজকে আলাদা সত্তা হিসেবে দেখতেন। তিনি মনে করতেন, সমাজ রাষ্ট্রের আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল এবং রাষ্ট্র কেবল সমাজের অধিকার রক্ষার জন্য গঠিত হয়েছে। রুশোর মতে, রাষ্ট্র হলো জনগণের সমষ্টিগত ইচ্ছা অর্থাৎ সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন। রাষ্ট্র ও সমাজ পরস্পর নির্ভরশীল এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব জনগণের সাধারণ ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
১৩। আইনের শাসন: হবস মনে করতেন, শাসকের ইচ্ছাই আইন, তাই আইনের শাসন বলতে কিছু ছিল না। শাসক আইনের উর্ধ্বে। লকের মতে, আইনের শাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। শাসকরাও আইনের অধীন। আইন জনগণের সম্মতির উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। রুশোর মতে, আইন হলো সাধারণ ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, যা সবার জন্য প্রযোজ্য এবং সবার দ্বারা মেনে চলা হবে।
১৪। গণতন্ত্রের ধারণা: হবসের মতে, গণতন্ত্রের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। জনগণের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একজন শাসকের হাতে থাকা উচিত। লকের মতে, সাংবিধানিক গণতন্ত্র বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র সম্ভব। জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসন করবে। রুশোর মতে, শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রই প্রকৃত গণতন্ত্র। জনগণ সরাসরি আইন প্রণয়নে অংশ নেবে।
১৫। নাগরিকের কর্তব্য: হবসের মতে, নাগরিকের একমাত্র কর্তব্য হলো শাসকের আদেশ মেনে চলা। কারণ এর বিনিময়ে তারা নিরাপত্তা লাভ করে। লকের মতে, নাগরিকের কর্তব্য হলো সরকারকে সমর্থন করা, যতক্ষণ সরকার জনগণের অধিকার রক্ষা করে। যদি সরকার ব্যর্থ হয়, তবে নাগরিকরা তাকে প্রতিরোধ করতে পারবে। রুশোর মতে, নাগরিকের প্রধান কর্তব্য হলো সাধারণ ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য থাকা।
১৬। বিরোধিতার অধিকার: হবস কোনো বিরোধিতার অধিকার স্বীকার করেননি। তিনি মনে করতেন, শাসকের বিরুদ্ধে কোনো বিরোধিতা করা হলে তা সমাজে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনবে। লক স্পষ্টভাবে বিরোধিতার অধিকারের কথা বলেছেন। তিনি মনে করতেন, শাসক যদি জনগণের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে তাদের তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর অধিকার আছে। রুশোর মতে, যদি সরকার সাধারণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করে, তবে জনগণের সেই সরকারকে প্রতিহত করার বা বদলে দেওয়ার অধিকার আছে।
১৭। স্বেচ্ছামূলক সম্মতি: হবস, লক এবং রুশো—এই তিন দার্শনিকই বিশ্বাস করতেন যে, সামাজিক চুক্তি জনগণের স্বেচ্ছাকৃত সম্মতির উপর ভিত্তি করে গঠিত। কিন্তু তাদের চুক্তির প্রকৃতি ভিন্ন ছিল। হবসের মতে, জনগণ স্বেচ্ছায় তাদের সমস্ত ক্ষমতা একজন শাসকের হাতে তুলে দেয়। লকের মতে, জনগণ তাদের অধিকার রক্ষার্থে স্বেচ্ছায় একটি সীমিত ক্ষমতা সম্পন্ন সরকার গঠনে সম্মত হয়। রুশোর মতে, ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় সমাজের সাধারণ ইচ্ছার সাথে নিজেকে এক করে নেয়।
১৮। ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব: হবসের মতে, চুক্তির পর ব্যক্তির কোনো সার্বভৌমত্ব থাকে না। সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে শাসকের হাতে চলে যায়। লকের মতে, ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব সীমিত। সরকার জনগণের অধিকার রক্ষা করবে, কিন্তু জনগণের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। রুশোর মতে, সার্বভৌমত্ব হলো জনগণের হাতে। তিনি মনে করতেন, সার্বভৌম ক্ষমতা অবিভাজ্য এবং তা কখনো হস্তান্তর করা যায় না।
উপসংহার: হবস, লক এবং রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। যদিও তাঁদের প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বতন্ত্র, তবুও তাঁদের চিন্তাভাবনা আধুনিক রাষ্ট্র, সরকার ও অধিকারের ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। হবসের মতে, রাষ্ট্র হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান, যা নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ধারণ করে। লকের মতে, রাষ্ট্র হলো জনগণের অধিকার রক্ষার একটি মাধ্যম, যা সীমিত ক্ষমতা নিয়ে কাজ করে। আর রুশোর মতে, রাষ্ট্র হলো জনগণের সমষ্টিগত ইচ্ছার প্রতিফলন। তাঁদের এই মতবাদের মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্র, স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জানতে পারি।
- 🎨 পয়েন্টসমূহ
- ✨ প্রকৃতির রাজ্য
- ✨ সামাজিক চুক্তির উদ্দেশ্য
- ✨ চুক্তির পক্ষ
- ✨ শাসকের ক্ষমতা
- ✨ মানবিক প্রকৃতি
- ✨ স্বাধীনতার ধারণা
- ✨ আইনের উৎস
- ✨ রাষ্ট্রের ভূমিকা
- ✨ ব্যক্তির অধিকার
- ✨ সরকারের ধরন
- ✨ ক্ষমতার উৎস
- ✨ রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক
- ✨ আইনের শাসন
- ✨ গণতন্ত্রের ধারণা
- ✨ নাগরিকের কর্তব্য
- ✨ বিরোধিতার অধিকার
- ✨ স্বেচ্ছামূলক সম্মতি
- ✨ ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব
সামাজিক চুক্তি মতবাদের ধারণাটি শুধুমাত্র এই তিন দার্শনিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক যেমন প্লেটো ও অ্যারিস্টটলও বিভিন্নভাবে রাষ্ট্র গঠনের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেছেন। আধুনিক যুগে থমাস হবসের ‘লেভিয়াথান’ (১৬৫১), জন লকের ‘টু ট্রিটিজ অফ গভর্নমেন্ট’ (১৬৮৯) এবং জ্যাঁ-জ্যাক রুশোর ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ (১৭৬২) গ্রন্থগুলো এই মতবাদের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব এবং আমেরিকায় ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতা ঘোষণা লক-এর চিন্তাধারার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) স্লোগান ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’ রুশোর সাধারণ ইচ্ছার ধারণারই প্রতিফলন। বিংশ শতাব্দীতে এই মতবাদকে কেন্দ্র করে আরও অনেক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে, যা আজও রাজনৈতিক দর্শনকে প্রভাবিত করে চলেছে।

