- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রাক কথা:- মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে আমরা একে অপরের সাথে নানা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি, তৈরি হয় বিভিন্ন নিয়মকানুন ও প্রথা। এই জটিল সামাজিক জালকে বুঝতে হলে প্রয়োজন হয় একটি শক্তিশালী হাতিয়ারের – সামাজিক জরিপ পদ্ধতি। এটি কেবল কিছু প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করাই নয়, বরং সমাজের গভীরে প্রবেশ করে মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস, এবং চাহিদাকে উন্মোচন করার এক বিজ্ঞানসম্মত প্রয়াস। আসুন, সহজ ভাষায় এই গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতির কিছু দিক আলোচনা করা যাক।
১.বাস্তব চিত্র উপস্থাপন:- সামাজিক জরিপ সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশের বা সমগ্র জনগোষ্ঠীর বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। মানুষের মতামত, দৃষ্টিভঙ্গি, এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে নীতি নির্ধারক এবং গবেষকগণ সমাজ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারেন।
২.সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও কারণ অনুসন্ধান:- জরিপের মাধ্যমে সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা, যেমন – দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বাল্যবিবাহ, অপুষ্টি ইত্যাদি চিহ্নিত করা যায়। শুধু তাই নয়, এই সমস্যাগুলোর গভীর কারণ অনুসন্ধান এবং এদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করাও সম্ভব হয়। ফলে, সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।
৩.পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন:- উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সামাজিক জরিপের তথ্য অপরিহার্য। কোথায়, কত মানুষের জন্য, কী ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রয়োজন, তা জরিপের মাধ্যমেই জানা যায়। এর ফলে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সুষম উন্নয়ন সম্ভব হয় এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
৪.নীতি নির্ধারণে সহায়তা:- একটি কার্যকর সমাজ গঠনে সঠিক নীতি নির্ধারণের গুরুত্ব অপরিসীম। সামাজিক জরিপ নীতি নির্ধারকদের জনগণের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে অবগত করে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জনকল্যাণমুখী নীতি প্রণয়ন করা সহজ হয় এবং তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
৫.পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন:- সময়ের সাথে সাথে সমাজে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। সামাজিক জরিপ একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে পরিচালিত করে এই পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করা যায়। কোনো একটি নির্দিষ্ট নীতি বা প্রকল্পের প্রভাবে সমাজে কতটা পরিবর্তন এসেছে, তাও জরিপের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা সম্ভব।
৬.জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামত:- সামাজিক জরিপ জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের একটি সুযোগ সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষ তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা সরাসরি জানাতে পারে। এর মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়ন হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
৭.সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন:- সামাজিক জরিপের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে জানা যায়। এই তথ্যের ভিত্তিতে সম্পদ এবং সুযোগ সুবিধার সুষ্ঠু বণ্টন করা সম্ভব হয়। বৈষম্য কমাতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৮. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি:- জরিপের ফলাফল যখন জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়, তখন সমাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাদের সচেতনতা বাড়ে। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে, যা একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে সাহায্য করে।
৯.গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টি:- সামাজিক জরিপ সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, নৃবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণার মূল ভিত্তি। জরিপের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে এবং বিদ্যমান তত্ত্বগুলোকে যাচাই করতে সহায়তা করে। এটি জ্ঞানের দিগন্ত প্রসারিত করে।
১০.কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ:- যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন। সামাজিক জরিপ সেই নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করে। ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় – যেকোনো পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সামাজিক জরিপের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
শেষকথা:- মোটকথা, সামাজিক জরিপ কেবল একটি তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নয়, এটি সমাজকে জানার, বোঝার এবং উন্নত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মাধ্যমে আমরা সমাজের দর্পণে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই এবং সেই অনুযায়ী ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারি। একটি প্রগতিশীল ও কল্যাণকর সমাজ গঠনে সামাজিক জরিপের গুরুত্ব অপরিসীম।
একনজরে সামাজিক জরিপ পদ্ধতির গুরুত্ব:
- বাস্তব চিত্র উপস্থাপন
- সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও কারণ অনুসন্ধান
- পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন
- নীতি নির্ধারণে সহায়তা
- পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন
- জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামত
- সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন
- সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
- গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টি
- কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
সামাজিক জরিপ পদ্ধতির ইতিহাস সুপ্রাচীন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চার্লস বুথের লন্ডনের দরিদ্র জীবন নিয়ে করা জরিপ (‘Life and Labour of the People in London’) একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একই সময়ে ফ্রেডরিক লি প্লে ফ্রান্সে শ্রমিক শ্রেণির জীবনযাত্রা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের ‘Le Suicide’ (১৮৯৭) জরিপভিত্তিক গবেষণার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে তিনি আত্মহত্যার সামাজিক কারণ অনুসন্ধানে পরিসংখ্যান ব্যবহার করেন। ১৯৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত জরিপের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়, যার মধ্যে জর্জ গ্যালপের কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরনের নমুনা জরিপ, যেমন – খানা জরিপ, স্বাস্থ্য জরিপ, জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (Demographic and Health Survey – DHS) বিশ্বব্যাপী সামাজিক গবেষণায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই পদ্ধতি সামাজিক পরিবর্তনের ধারা বুঝতে এবং নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

