- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: আমাদের সমাজে নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে—যেমন অসুস্থতা, বার্ধক্য, বেকারত্ব, বা দুর্ঘটনা। এসব অপ্রত্যাশিত ঘটনায় মানুষ প্রায়শই অসহায় হয়ে পড়ে। সামাজিক নিরাপত্তা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যা মানুষকে এই ধরনের সংকট থেকে রক্ষা করে এবং তাদের জীবনযাত্রার একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রাখতে সহায়তা করে। এটি একটি সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি উপায়।
শাব্দিক অর্থ: ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো সমাজে বসবাসকারী মানুষের জন্য একটি সুরক্ষিত ও স্থিতিশীল অবস্থা নিশ্চিত করা।
সামাজিক নিরাপত্তা হলো এমন একটি নীতি বা কর্মসূচি, যা রাষ্ট্র বা সমাজ যৌথভাবে পরিচালনা করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করা। এটি কেবল দরিদ্র বা অসহায় মানুষের জন্য নয়, বরং সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের জন্য একটি নিরাপত্তা জাল তৈরি করে। এটি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে এবং তাদের ন্যূনতম জীবনধারণের অধিকার নিশ্চিত করে।
যারা সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
১। অগবার্ন (Ogburn): তিনি সরাসরি সংজ্ঞা না দিলেও তার সমাজতত্ত্বের গবেষণায় সামাজিক কাঠামোর স্থিতিশীলতা এবং ঝুঁকির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা সামাজিক নিরাপত্তার ধারণার সাথে সম্পর্কিত।
২। কার্ল মার্কস (Karl Marx): তিনি পুঁজিবাদের সমালোচনা করে বলেছেন যে, শ্রমিক শ্রেণির জন্য কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা নেই এবং রাষ্ট্রকে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৩। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): তিনি সামাজিক সংহতির ওপর জোর দিয়েছেন, যা সমাজের প্রতিটি সদস্যকে একত্রে আবদ্ধ করে এবং একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করে, যা পরোক্ষভাবে সামাজিক নিরাপত্তার ধারণা দেয়।
৪। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): এটি সামাজিক নিরাপত্তা বলতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা বা সুবিধা বোঝায়, যা অসুস্থতা, বেকারত্ব বা অবসর গ্রহণের মতো পরিস্থিতিতে নাগরিকদের জীবনধারণের জন্য প্রদান করা হয়।
৫। এল.ডি. হোয়াইট (L.D. White): তিনি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সরকারি নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন, যা নাগরিকের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করে।
৬। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): তারা সামাজিক নিরাপত্তাকে এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন যা সরকারের মাধ্যমে প্রদত্ত হয় এবং সমাজের ঝুঁকি ও অস্থিতিশীলতা হ্রাস করে।
১। লুথার গুলিক (Luther Gulick): “সামাজিক নিরাপত্তা হলো মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য সরকারের একটি প্রচেষ্টা।” (Social Security is an effort by the government to reduce economic risk in people’s lives.)
২। সাইমন, স্মিথবার্গ ও থাম্পসন (Simon, Smithburg and Thompson): “সামাজিক নিরাপত্তা হলো একটি সরকারি ব্যবস্থা যা নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য পরিচালিত হয়, যেমন স্বাস্থ্যসেবা ও অবসরকালীন ভাতা।” (Social security is a government system operated to meet the basic needs of citizens, such as health care and retirement benefits.)
৩। উড্র উইলসন (Woodrow Wilson): “সামাজিক নিরাপত্তা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যা জাতিকে তার সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গড়ে তুলতে হয়।” (Social Security is a system that a nation must build to ensure the security of its members.)
৪। ডিমক ও ডিমক (Dimok and Dimok): “সামাজিক নিরাপত্তা হলো একটি নীতি যা সমাজের সদস্যদের জন্য অর্থনৈতিক সুরক্ষা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করে।” (Social security is a policy that ensures economic protection and welfare for the members of society.)
৫। জে. এ. ডিগ: “সামাজিক নিরাপত্তা হলো সেই ব্যবস্থা যা জনগণের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সাহায্য করে।” (Social security is the system that helps people cope with social risks as well as personal safety.)
৬। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): “সামাজিক নিরাপত্তা হলো জনসেবার এমন একটি ক্ষেত্র, যা সমাজের দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশকে সুরক্ষা দেয়।” (Social security is a field of public service that protects the vulnerable and at-risk parts of society.)
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, সামাজিক নিরাপত্তা হলো একটি রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক কাঠামো, যা ব্যক্তি ও পরিবারকে অসুস্থতা, অক্ষমতা, বেকারত্ব, বার্ধক্য বা অন্যান্য অপ্রত্যাশিত সংকট থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা প্রদান করে, যাতে তারা সম্মান ও মর্যাদার সাথে জীবন ধারণ করতে পারে।
উপসংহার: সামাজিক নিরাপত্তা কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, এটি একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সমতা নিশ্চিত করতে অপরিহার্য। এটি রাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব, যা নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে এবং একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে সহায়তা করে। এটি এক ধরনের বিনিয়োগ, যা সমাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করে।
সামাজিক নিরাপত্তা হলো এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা নাগরিকদের জীবনের অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সুরক্ষা দেয়।
সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর ২০০৮ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র ২০% মানুষ সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ছিল। বর্তমানে এটি প্রায় ৬০% এ উন্নীত হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে এটি প্রায় শতভাগ হলেও, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো অনেক পিছিয়ে। ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG) অংশ হিসেবে সকলের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।

