- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মানুষ হিসেবে আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি এমন এক সমাজের, যেখানে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবে, কেউ কারো চেয়ে ছোট বা বড় হবে না। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মূলমন্ত্রই হলো সাম্য। এটি এমন একটি ধারণা যা শুধু আইন বা নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও পারস্পরিক সম্পর্কেও এর প্রতিফলন থাকা উচিত।
সাম্যের পরিচয়:-
সাম্য শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো সমতা, সমানতা বা সমভাব। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে কোনো বৈষম্য বা পার্থক্য থাকে না, সবাই সমান চোখে দেখা হয়।
সাম্য বলতে বোঝায় এমন একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে সকল ব্যক্তি তাদের যোগ্যতা ও প্রয়োজন অনুসারে সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এর মূল লক্ষ্য হলো সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
সাধারণভাবে আমরা যখন সাম্যের কথা বলি, তখন আমরা মনে করি যে সবার কাছে সবকিছু সমানভাবে বণ্টন করা উচিত। এর অর্থ এই নয় যে সবার কাছে একই রকম জিনিস থাকবে, বরং এর অর্থ হলো সবার মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে এবং প্রত্যেকের জন্য তাদের সম্ভাবনা বিকাশের সমান সুযোগ থাকবে। কেউ যেন শুধুমাত্র তার জন্ম, লিঙ্গ, ধর্ম, জাতি বা অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে কোনো সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটাই সাম্যের মূল লক্ষ্য।
১। কার্ল মার্কস: “সাম্য বলতে বোঝায় উৎপাদন ও বিতরণের ক্ষেত্রে সকলের সমান অধিকার, যা শেষ পর্যন্ত একটি শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে।” (Equality means equal rights in the sphere of production and distribution, ultimately leading to a classless society.)
২। জাঁ-জাঁক রুসো: “সাম্য হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যদের ওপর প্রভুত্ব করতে পারে না।” (Equality is a state where no individual or group dominates another.)
৩। ড. বি. আর. আম্বেডকর: “সাম্য কেবল আইনের চোখে সমান অধিকার নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগের সমবণ্টন।” (Equality is not just equal rights before the law, but fair distribution of social and economic opportunities.)
৪। জন রলস: “ন্যায়ের ভিত্তিতে গঠিত সমাজে সাম্য হলো সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ নিশ্চিত করা।” (Equality in a just society means ensuring the greatest benefit for the least advantaged.)
৫। মহাত্মা গান্ধী: “সাম্য হলো আত্মার স্বীকৃতি, যেখানে প্রতিটি মানুষই ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং সমান মর্যাদার অধিকারী।” (Equality is the recognition of the soul, where every human is a creation of God and deserves equal dignity.)
৬। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস: “সাম্য অর্জনের জন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অপরিহার্য, যেখানে সবাইকে আয়ের সমান সুযোগ দেওয়া হয়।” (To achieve equality, economic freedom is essential, where everyone has equal opportunities to earn.)
৭। অ্যামার্ত্য সেন: “সাম্যকে অবশ্যই দেখা উচিত ক্ষমতা ও সুযোগের সমতা হিসাবে, যা মানুষকে তাদের পছন্দসই জীবন যাপন করার স্বাধীনতা দেয়।” (Equality should be seen as equality of capabilities and opportunities, which allows people the freedom to live the lives they have reason to value.)
সাম্য হলো একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, যেখানে সকল মানুষ ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সমান অধিকার, সুযোগ ও মর্যাদা পায়।
উপসংহার: সাম্য কেবল একটি ধারণা নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। একটি প্রগতিশীল এবং মানবিক সমাজ গঠনের জন্য সাম্য অপরিহার্য। এটি নিশ্চিত করে যে প্রত্যেকের নিজস্ব মূল্য আছে এবং প্রত্যেকেরই সম্মান ও মর্যাদার সাথে বাঁচার অধিকার আছে। সাম্যের চর্চা শুধু আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতেও এর প্রতিফলন ঘটানো জরুরি। একটি সাম্যভিত্তিক সমাজই পারে সত্যিকারের শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনতে।
সাম্য হলো সম্মান, সুযোগ ও অধিকারের ক্ষেত্রে সকল মানুষের সমানাধিকার।
২০১৫ সালে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে বৈষম্য হ্রাস করা। বৈশ্বিক দারিদ্র্য ২০১০ সালের ৪৩% থেকে ২০১৯ সালে ৯.২%-এ নেমে এসেছে, যা সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক। তবে, অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১% ধনীরা বাকি ৯৯% মানুষের মোট সম্পদের প্রায় দ্বিগুণ মালিক ছিল, যা অর্থনৈতিক অসমতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সূচক অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কোনো দেশই লিঙ্গ সমতা সম্পূর্ণরূপে অর্জন করতে পারেনি।

