- readaim.com
- 0
ভূমিকা:সিন্ধু সভ্যতা, যা হরপ্পা সভ্যতা নামেও পরিচিত, ভারতীয় উপমহাদেশের এক প্রাচীন ও বিস্ময়কর অধ্যায়। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে এর বিকাশ ঘটেছিল। এই সভ্যতা শুধু তার প্রাচীনত্বের জন্যই নয়, বরং এর নগর পরিকল্পনা, উন্নত জীবনযাপন এবং সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির জন্যেও সুপরিচিত। সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই সভ্যতা আধুনিক বিশ্বের কাছে এক হারিয়ে যাওয়া জ্ঞান ও ঐতিহ্যের স্মারক।
১.উন্নত নগর পরিকল্পনা: সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর সুসংবদ্ধ নগর পরিকল্পনা। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো এবং লোথালের মতো শহরগুলিতে রাস্তাঘাট ছিল সমান্তরাল এবং একে অপরের সাথে সমকোণে ছেদ করত। শহরগুলি দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল – একটি উঁচু দুর্গ (সিটাডেল) এবং একটি নিচু শহর। প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, মহেঞ্জোদারোর রাস্তার প্রস্থ ৯ থেকে ৩৪ ফুট পর্যন্ত ছিল, যা সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত আধুনিক বলে বিবেচিত হয়। ১৯২০-এর দশকে স্যার জন মার্শাল এবং তার দল যখন এই শহরগুলো আবিষ্কার করেন, তখন তারা এর নগর কাঠামো দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।
২.সুপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা: সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলিতে একটি অত্যন্ত উন্নত এবং কার্যকরী পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল। প্রতিটি বাড়ি থেকে আবর্জনা এবং বর্জ্য জল সরানোর জন্য ভূগর্ভস্থ নর্দমা ব্যবহার করা হত, যা পোড়া ইটের তৈরি ছিল। এই নর্দমাগুলি শহরের প্রধান নর্দমার সাথে যুক্ত ছিল এবং নিয়মিত পরিষ্কার করার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে ম্যানহোলও ছিল। এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা এতটাই উন্নত ছিল যে, এটি আধুনিক শহরগুলির পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সাথে তুলনীয়। ১৯২২ সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের সময় এই ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
৩.পোড়া ইটের ব্যবহার: সিন্ধু সভ্যতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পোড়া ইটের ব্যাপক ব্যবহার। বাড়িঘর, দুর্গ এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে মানসম্মত পোড়া ইট ব্যবহার করা হত, যার ফলে স্থাপত্যগুলি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। ইটের আকার সাধারণত ৪:২:১ অনুপাতে তৈরি করা হত, যা তৎকালীন সময়ে একটি মানসম্মত নির্মাণ পদ্ধতি নির্দেশ করে। ১৯২১ সালে দয়ারাম সাহানি হরপ্পায় খনন করার সময় এই ইটের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করেন, যা এই সভ্যতার উন্নত নির্মাণশৈলীর পরিচায়ক।
৪.কৃষি অর্থনীতি ও শস্য উৎপাদন: সিন্ধু সভ্যতার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। সিন্ধু নদের উর্বর পলিমাটিতে গম, বার্লি, ডাল এবং সরিষার মতো শস্য উৎপাদন করা হত। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে তারা একাধিক ফসল চাষের পদ্ধতি অনুসরণ করত। ২০০৬ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, এই অঞ্চলে শীতকালীন শস্য যেমন গম এবং বার্লি এবং গ্রীষ্মকালীন শস্য যেমন বাজরা ও তিল উভয়ই উৎপাদিত হত, যা তাদের কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার প্রমাণ।
৫.বাণিজ্য ও বিনিময় প্রথা: সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যে লিপ্ত ছিল। মেসোপটেমিয়া, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ার সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন সিলমোহর, ওজন ও পরিমাপের যন্ত্রের আবিষ্কার এই বাণিজ্যের প্রমাণ দেয়। প্রায় ২০০০টি সিলমোহর আবিষ্কৃত হয়েছে, যা বাণিজ্য কার্যক্রমে তাদের ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরে। ১৯৩০-এর দশকে আর্নেস্ট ম্যাকে এই সিলমোহরগুলির বাণিজ্যিক গুরুত্ব নিয়ে বিশদ গবেষণা করেন, যা তাদের বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্ককে প্রমাণ করে।
৬.শিল্পকলা ও কারুশিল্প: সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা শিল্পকলা ও কারুশিল্পে যথেষ্ট উন্নত ছিল। পোড়ামাটির মূর্তি, ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্যরত নারী মূর্তি, পাথরের ভাস্কর্য এবং অলঙ্কার তাদের শৈল্পিক দক্ষতার পরিচয় বহন করে। লোথালে আবিষ্কৃত একটি ব্রোঞ্জের রথ তাদের ধাতু শিল্পের উচ্চমান নির্দেশ করে। ১৯২৮ সালে জন মার্শাল কর্তৃক আবিষ্কৃত ‘নৃত্যরত মেয়ে’ মূর্তিটি সিন্ধু সভ্যতার শিল্পকলার এক অসাধারণ উদাহরণ, যা তাদের নান্দনিকতা ও দক্ষতা প্রদর্শন করে।
৭.লিখন পদ্ধতি ও সিলমোহর: সিন্ধু সভ্যতার একটি নিজস্ব লিখন পদ্ধতি ছিল, যা আজও সম্পূর্ণরূপে পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই লিখন পদ্ধতি মূলত সিলমোহরগুলিতে খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রায় ২৬০০টি সিলমোহর আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে এই চিত্রলিপির ব্যবহার দেখা যায়। এই সিলমোহরগুলি সম্ভবত বাণিজ্যিক বা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হত। ২০০৯ সালের একটি গবেষণা অনুসারে, এই লিপির প্রতিটি চিহ্নের একটি নির্দিষ্ট অর্থ ছিল, যা সম্ভবত ভাষা এবং যোগাযোগের একটি উন্নত ব্যবস্থা নির্দেশ করে।
৮.সামাজিক স্তরবিন্যাস: যদিও সিন্ধু সভ্যতার সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না, তবে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক স্তরবিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। শহরের দুর্গ এবং নিচু শহরের বিভাজন, বিভিন্ন আকারের বাড়িঘর এবং সমাধি থেকে বোঝা যায় যে সমাজে শাসক শ্রেণী, কারিগর, ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকদের মতো বিভিন্ন স্তর ছিল। ১৯২৫ সালে মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত একটি ‘পুরোহিত রাজা’র মূর্তি সম্ভবত তাদের শাসক শ্রেণীর অংশ ছিল বলে ধারণা করা হয়।:-
৯.ধর্মীয় বিশ্বাস: সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না, তবে আবিষ্কৃত মূর্তি ও সিলমোহর থেকে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। ‘মাতৃদেবী’ এবং ‘পশুপতি শিব’ (প্রটো-শিব) এর উপাসনার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন পশু, গাছ এবং লিঙ্গমূর্তি পূজারও ইঙ্গিত মেলে। ১৯৭০-এর দশকে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত এই মূর্তিগুলো সিন্ধু সভ্যতার মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের একটি চিত্র তুলে ধরে।
১০.পরিমাপ ও ওজন পদ্ধতি: সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা একটি সুসংবদ্ধ পরিমাপ ও ওজন পদ্ধতি ব্যবহার করত। আবিষ্কৃত বিভিন্ন আকারের ওজন এবং পরিমাপের স্কেল তাদের বাণিজ্যিক লেনদেন ও নির্মাণ কাজে নির্ভুলতা বজায় রাখার প্রমাণ দেয়। ওজনগুলি সাধারণত চুনার পাথর বা ফ্লিণ্ট পাথরের তৈরি ছিল এবং ১৬-এর গুণিতকে ব্যবহৃত হত (যেমন ১৬, ৩২, ৬৪ ইত্যাদি)। ২০০২ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, এই ওজন পদ্ধতি আধুনিক মেট্রিক পদ্ধতির মতোই সুসংবদ্ধ ছিল, যা তাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও দক্ষতার পরিচয়।
উপসংহার:- সিন্ধু সভ্যতা এক অসাধারণ প্রাচীন সভ্যতা, যা আধুনিক বিশ্বের কাছে তার উন্নত নগর পরিকল্পনা, সুসংবদ্ধ জীবনযাপন এবং শৈল্পিক দক্ষতার জন্য এক অনুপ্রেরণা। এর রহস্যময় লিখন পদ্ধতি এবং আকস্মিক পতন আজও গবেষকদের কাছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। এই সভ্যতার আবিষ্কার মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উন্মোচন করেছে এবং এটি প্রমাণ করে যে প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে এক উন্নত ও সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল।
- **উন্নত নগর পরিকল্পনা
- **সুপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা
- **পোড়া ইটের ব্যবহার
- **কৃষি অর্থনীতি ও শস্য উৎপাদন
- **বাণিজ্য ও বিনিময় প্রথা
- **শিল্পকলা ও কারুশিল্প
- **লিখন পদ্ধতি ও সিলমোহর
- **সামাজিক স্তরবিন্যাস
- **ধর্মীয় বিশ্বাস
- **পরিমাপ ও ওজন পদ্ধতি
সিন্ধু সভ্যতা প্রায় ৪৭০০ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম অংশে বিকশিত হয়েছিল। ১৯২০-এর দশকে যখন হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো আবিষ্কৃত হয়, তখন এর বিশালতা ও আধুনিকতা দেখে বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, সিন্ধু সভ্যতার পতনের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, সিন্ধু নদের গতিপথ পরিবর্তন বা আর্যদের আক্রমণ দায়ী হতে পারে। ২০১৪ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রত্নতাত্ত্বিকরা হরিয়ানার রাখিগড়িতে সিন্ধু সভ্যতার বৃহত্তম নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন, যা প্রায় ৩৫০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই আবিষ্কার সিন্ধু সভ্যতার ব্যাপকতা এবং এর অজানা দিক সম্পর্কে নতুন তথ্য উন্মোচন করেছে।

