- readaim.com
- 0
উত্তর::উপক্রমণিকা: টমাস হবসের সামাজিক চুক্তি তত্ত্বটি হলো আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এই তত্ত্বের মাধ্যমে হবস দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তাঁর মতে, মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর এবং ক্ষমতা লোভী। তাই, স্বাভাবিক অবস্থায় সমাজে সবসময় সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ একটি চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
টমাস হবস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’-এ সামাজিক চুক্তির ধারণাটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করেন, চুক্তিটির মূল ভিত্তি হলো মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা। হবসের মতে, এই প্রাকৃতিক অবস্থা ছিল ‘যুদ্ধং দেহি‘ অবস্থা, যেখানে ‘সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ‘ চলত। অর্থাৎ, সেখানে কোনো আইন, বিচার বা নৈতিকতা ছিল না। প্রত্যেকেই শুধু নিজের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য অন্যের সাথে লড়াই করত। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের কিছু অধিকার ও ক্ষমতা একজন সার্বভৌম শাসকের হাতে তুলে দেয়। এই চুক্তির মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র বা ‘লেভিয়াথান‘ গঠিত হয়, যার প্রধান কাজ হলো আইন প্রয়োগ করে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
হবস মনে করতেন, একবার এই চুক্তি সম্পাদিত হলে তা আর ভঙ্গ করা যায় না। সার্বভৌম শাসককে ক্ষমতা দেওয়া হয় নিরঙ্কুশভাবে, যাতে সে তার সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে। হবসের মতে, এই শাসক কোনো ব্যক্তি হতে পারে, আবার কোনো গোষ্ঠীও হতে পারে। তবে, তার ক্ষমতা প্রশ্নাতীত এবং চূড়ান্ত। মানুষ তাদের জীবনের নিরাপত্তার বিনিময়ে তাদের স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে সমাজকে রক্ষা করা।
উপসংহার: হবসের সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব হলো মানব সমাজের বিবর্তন ও রাষ্ট্র গঠনের একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা। তিনি দেখিয়েছেন যে, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় তাদের কিছু স্বাধীনতা ত্যাগ করে একটি শক্তিশালী সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের অধীনে আসে।
হবসের মতে সামাজিক চুক্তি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য স্বেচ্ছায় নিজেদের স্বাধীনতা একজন সার্বভৌম শাসকের কাছে সমর্পণ করে।
১৬৫১ সালে প্রকাশিত হবসের ‘লেভিয়াথান’ বইটি আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের একটি মাইলফলক। বইটি ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের (১৬৪২-১৬৫১) ভয়াবহতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা হয়েছিল। এই যুদ্ধের ফলে হবসের মনে হয়েছিল যে, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়া সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাঁর এই তত্ত্ব পরবর্তীকালে লক ও রুশোর মতো দার্শনিকদের সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করে।

