- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: ১৮৩৪ সালের দরিদ্র আইন সংস্কার (Poor Law Amendment Act 1834) ছিল ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন, যা দরিদ্রদের প্রতি রাষ্ট্রের সহায়তা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে। এই আইনটিকে “নতুন দরিদ্র আইন” (New Poor Law) হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
প্রেক্ষাপট: ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে ইংল্যান্ডে দরিদ্রদের জন্য ১৬০১ সালের পুরোনো দরিদ্র আইন (Old Poor Law) প্রচলিত ছিল। এই আইনের অধীনে স্থানীয় প্যারিশগুলো তাদের নিজ নিজ এলাকার দরিদ্রদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করত, যেমন – নগদ অর্থ, খাদ্য বা কাজের ব্যবস্থা। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের ফলে দারিদ্র্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং পুরোনো আইনটি অকার্যকর প্রমাণিত হতে থাকে। এর ফলে দরিদ্রদের সহায়তার জন্য প্রচুর খরচ হতে থাকে এবং মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে এই খরচ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। এর প্রেক্ষাপটে ১৮৩২ সালে একটি রাজকীয় কমিশন গঠন করা হয়, যার সুপারিশের ভিত্তিতে ১৮৩৪ সালের দরিদ্র আইন সংস্কার করা হয়।
এই নতুন আইনের মূল লক্ষ্য ছিল দরিদ্রদের প্রতি সহায়তা কমিয়ে আনা এবং তাদের কঠোর পরিশ্রমের জন্য উৎসাহিত করা। এর প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো:
১. ওয়ার্কহাউস ব্যবস্থা (Workhouse System): এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ওয়ার্কহাউস বা শ্রম-সদনের প্রবর্তন। যারা কর্মক্ষম ও বেকার, তাদের জন্য বাইরে থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা (outdoor relief) নিষিদ্ধ করা হয়। তাদের একমাত্র উপায় ছিল ওয়ার্কহাউসে প্রবেশ করা।
২. কঠোর শর্ত: ওয়ার্কহাউসের জীবনযাত্রা ইচ্ছাকৃতভাবে কঠোর ও অপ্রীতিকর করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র চরম অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিরাই যেন সেখানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ওয়ার্কহাউসে পরিবারকে বিভক্ত করা হতো (স্বামী-স্ত্রী, শিশু, প্রাপ্তবয়স্কদের আলাদা রাখা হতো), কঠোর পরিশ্রমের কাজ করানো হতো এবং খাবার ও পোশাক ছিল নিম্নমানের।
৩. কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ: পুরোনো আইনের স্থানীয় প্যারিশভিত্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে এই নতুন আইন একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। পুরো ইংল্যান্ড ও ওয়েলসকে দরিদ্র আইন ইউনিয়নে (Poor Law Unions) বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি ইউনিয়নকে একটি করে ওয়ার্কহাউস পরিচালনা করতে বলা হয়। একটি কেন্দ্রীয় দরিদ্র আইন কমিশন (Poor Law Commission) এই ইউনিয়নগুলোর কাজ তদারকি করত।
৪. ব্যয় হ্রাস: এই আইনের একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্রদের সহায়তার জন্য রাষ্ট্রের ব্যয় কমানো। ওয়ার্কহাউসের কঠোর পরিবেশের কারণে অনেকেই সেখানে যেতে চাইত না, ফলে দরিদ্রদের জন্য ব্যয় কমে যায়।
প্রতিক্রিয়া: ১৮৩৪ সালের এই আইনটি ব্রিটিশ সমাজে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয়। এর বিরোধীরা এটিকে “নিষ্ঠুর” ও “অমানবিক” বলে অভিহিত করে। তাদের মতে, এই আইন দারিদ্র্যকে নৈতিক দুর্বলতা হিসেবে দেখে এবং অসহায় মানুষকে অযথা কষ্ট দেয়। যদিও এর সমর্থকরা এটিকে রাষ্ট্রের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে এবং অলসতাকে নিরুৎসাহিত করার জন্য একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মনে করত।
সংক্ষেপে:- ১৮৩৪ সালের দরিদ্র আইন সংস্কার ছিল দরিদ্রদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির একটি বড় পরিবর্তন। এটি দরিদ্রদের প্রতি সহায়তাকে অধিকারের পরিবর্তে একটি কঠোর শর্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং এর মাধ্যমে ওয়ার্কহাউস ব্যবস্থা চালু করে, যা ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম বিতর্কিত সামাজিক প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।

