- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। এই নির্বাচন শুধু পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্যই নয়, বরং বাঙালি জনগণের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পটভূমি:
১। পাকিস্তানি শাসনের বৈষম্য: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। এই বৈষম্য জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি তৈরি করে।
২। ভাষা আন্দোলনের প্রভাব: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বাঙালিদের মধ্যে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়।
৩। ছয় দফা আন্দোলন: ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুস্পষ্ট রূপ দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এই কর্মসূচির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এই ছয় দফা জনগণের প্রধান রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়।
৪। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান: আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনে। ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
৫। সামরিক শাসনের অবসানের দাবি: দীর্ঘদিনের সামরিক শাসনের কারণে জনগণের মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
৬। ইয়াহিয়া খানের নির্বাচন ঘোষণা: ১৯৬৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের নির্বাচন এবং পরবর্তীতে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যেখানে জনগণ সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়।
৭। আওয়ামী লীগের ছয় দফাভিত্তিক প্রচারণা: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছয় দফা কর্মসূচিকে নির্বাচনী ইশতেহারের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। দলটি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর ফলে জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি হয়।
৮। ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব: ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে ভয়াবহ ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বল ত্রাণ কার্যক্রম ও অব্যবস্থাপনার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়। এটি নির্বাচনের পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
৯। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ: ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জনগণ নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, যা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১০। গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা: পাকিস্তানের জনগণ দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করছিল। তাই ১৯৭০ সালের নির্বাচন জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
উপসংহার: ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈষম্য, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশের ফলাফল। এই নির্বাচন বাঙালি জনগণের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথকে আরও সুগম করে।